স্কুল আছে, পরীক্ষা ও সিলেবাস নেই

30 Shares

মেজবাহুল হক
ইতালির বলনিয়া শহরের অদূরে, শহুরে কোলাহল থেকে একটু আড়ালে গড়ে ওঠা একটা ব্যাতিক্রমধর্মী স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়েছিলো। ইতালিয়ান ভাষায় স্কুলের নাম i passerotti’ বাংলায় এর অর্থ দাড়ায় “চড়ুই পাখি”। এখানে স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার হাতেখড়ি নেয় শিশুরা। মজার ব্যাপার এখানে চার দেয়ালের মধ্যে কোন ক্লাস নেয়া হয় না। নির্দিষ্ট সিলেবাস নেই, পরীক্ষাও দিতে হয় না। যা ইচ্ছা তাই করার দারুন সুযোগ মিলে এই স্কুলে। তবে অন্য স্কুলগুলোর মতো এখানেও স্কুলের শুরু ৯টায় চলে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত। ১ থেকে ৬ বছর বয়সে যা যা করতে ভাল লাগে বা যা করতে ইচ্ছা করে সেসব করার সব উপকরণই আছে এখানে। শিক্ষার্থীদের কোন কিছু করতে নিষেধাজ্ঞা নেই। তাদেরকে শুধু ‘ভাল’ আর ‘মন্দ’ সম্পর্কে দিকনির্দেশনা দেওয়া থাকে। তারপর তাকে পছন্দ করতে দেয়া হয় সে কোনটা চায়।

দৌড়াতে গিয়ে পড়ে গেলে নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করে উঠে দাড়াতে। মারামারিও যে টুকটাক হয় না তা কিন্তু নয়, তবে নিজেরাই আবার দুঃখ প্রকাশ করে; সরি বলে কোলাকুলি করে নেয়। একজন কান্না করলে ৩ জন ছুটে আসে থামাতে। মনের ভালো লাগা থেকে কেউ মেতে ওঠে ফুটবল খেলায়, কারও আগ্রহ থাকে সাইকেল চালানোয়। কেউ আবার গাছ বাইতে শুরু করে দেয়। কারও আবার দেখা মেলে মাটিতে গড়াগড়ি দিতে। কেউ আবার সাতার কাটে। এখানের স্কুল টাইমে কারও আবার সবজি চাষ করতে, মুরগী পালতে দেখা যায়। শিশু কিশোরদের অভিভাবকরা অবসরে এদের সাথে কাজ করে। মনোবিজ্ঞানীরা খেয়াল করেছেন, ‘ছোট বাচ্চারা বাবা মায়ের আদেশ নিষেধ মুখে শোনার থেকে বাবা মাকে অনুসরণ করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে’। আর এ স্কুলের শিশুদের শেখানোর ধরণ শুধুমাত্র নীতিবাক্য নয় বরং, কাজ।

শিক্ষকের কাছ থেকে প্রতিদিন তারা ইশপ থেকে রূপকথা সবধরনের গল্পই পালা করে শোনে। যার ছবি আঁকতে ভাল লাগে সে ছবি আঁকে, গানের প্রতি ঝোক প্রবণতা যার সে গান বাজনা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। প্রতিযোগিতা বা কাউকে নিচে ফেলে আমাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এমন কোনো প্রতিযোগিতা এখানে হয় না। এই মনোভাব থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টা চলে সবসময় এখানে। জুতার ফিতা খুলে গেলে শিক্ষকের কাছে দৌড়ে গিয়ে বেঁধে দিতে বলে, মন চাইলে দৌড়ে এসে শিক্ষককে জড়িয়ে ধরে, কখনো বা চুমু খায়। কোনো কিছুই এখানে নিষিদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়েই এখানে গড়ে ওঠে ছাত্র-শিক্ষক বন্ধুত্ব ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। প্রতিদিন নানা ধরণের কার্যক্রম থাকে এই স্কুলে, যা শিক্ষার্থীকে একা বা দলগতভাবে করতে হয়। এই কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে ওরা নানান কিছু শিখে ফেলে। এখানের অভিভাবকরা চান প্রকৃতির মত করেই যেন বেড়ে ওঠে তাদের সন্তান। এরকম আরও অনেক বৈশিষ্ট্যই আছে এই স্কুলের।

স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা স্টেফানিয়া, যিনি জার্মানি থেকে এইধরনের স্কুলের কারিকুলাম নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা করার পরে এই স্কুল চালান। কথা হয় তার সাথে তিনি জানান, সন্তানের সুস্থ ও সম্পূর্ণ বিকাশের জন্য প্রকৃতি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান! তাই আমরা চাই প্রকৃতির সাথে সখ্যতা গড়েই হোক আমাদের পথচলা। প্রকৃতির মাঝেই শিশুরা ভাবতে, চিন্তা করতে, সেভাবে নিজেকে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখে। তারা শেখে অপেক্ষা করতে এবং যতœ নিতে। এই স্কুলে আমরা বিশ্বাস করি খারাপ আবহাওয়া বলে কিছু নেই, সাময়িক কিছু কাপড় নোংরা হওয়া ছাড়া কোন কিছুই ভয়ঙ্কর নয়। বৃষ্টি বা রোদ, তুষার বা ঝড় বাতাস সবকিছু মোকাবেলা করার মত সামর্থ্য আমাদের থাকা উচিৎ। প্রকৃতির মাঝে থেকেই দায়িত্ব¡শীল, সচেতন, বিবেকবান, স্নেহপূর্ণ, বিশ্বাসযোগ্য হয়েই বেড়ে ওঠে, যেটা কিনা অনেক সময় বড়দেরকেও শিক্ষা দিয়ে থাকে”।

নরওয়ে, সুইডেন থেকে শুরু করে জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালি সবখানেই এই আউটডোর স্কুলের ধারণা খুব দ্রুততার সাথে সমাদৃত হচ্ছে। শুধু ইউরোপ অ্যামেরিকা না, এমনকি জাপান, সিঙ্গাপুরেও ছোটদের জন্য নির্দিষ্ট সিলেবাসে পরীক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ করে দিচ্ছে। মানুষকে মূল্যায়ন, সম্পর্কগুলোকে অনুধাবন, মানবিকতা, সহনশীলতা বা শিষ্টাচার এগুলোর প্রতি তারা ছোট বয়স থেকেই যেন যতœবান হয় সেটার উপর বেশি জোর দিচ্ছে।

অথচ আমাদের দেশে বর্তমানে ‘অতি সচেতন’ এক অভিভাবক শ্রেণি তৈরি হয়েছে যারা সন্তানের স্বাস্থ্য নিয়ে বা ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়াবহ রকমের সিরিয়াস। দৌড়ালে পড়ে যাবে, রোদে গেলে বা বৃষ্টিতে ভিজলে অসুস্থ হবে, এইটুকুন বয়সে ১০ ঘণ্টা না পড়লে বা ৪/৫ টা টিউটর না দিলে ভবিষ্যৎ অন্ধকার, এরকম অহেতুক হাজারো দুশ্চিন্তা নিয়ে ব্যস্ত তারা। তার উপর আবার যোগ হয়েছে স্মার্ট ফোন বা ট্যাবের আদিখ্যেতা। স্মার্টফোনে গেম খেলতে না দিলে বা ভিনদেশী ভাষার কার্টুন না দেখতে দিলে খায় না। শহুরে জীবন আর ইন্টারনেট এর প্রভাব পরের প্রজন্মকে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত করে বেড়ে তুলবে। প্রযুক্তির এই যথেচ্ছ ব্যাবহার খারাপ বৈ ভাল কিছু বয়ে আনবে না। আমার আফসোস হয় এই ভিডিও গেমস আর নানা আদিখ্যেতার চাপে এরা চাঁদমামা, চাঁদের বুড়ির খোঁজ পাবে না কখনো। রাজার কুমার, কোটাল কুমার, পঙ্খীরাজ ঘোড়ার কথা জানবে না কখনো। কাজলা দিদির কথা শুনবে না, জোনাকি পোকাও কখনো দেখবে না। আলাদিন আর জাদুর জীনি বা আলীবাবা চল্লিশ চোরের গল্প শুনবে না কখনো। বৃষ্টিতে ভিজে কাদামাটির গন্ধ পাবে না কখনো। পুকুরে বা নদীতে পা দাপিয়ে সাঁতরানোর আনন্দ পাবে না কখনো। জ্যৈষ্ঠ মাসে আম কুড়ানোর মজা পাবে না কখনো। গ্রামের মেলায় হাওয়াই মিঠাই এর স্বাদ পাবে না কখনো।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার ‘শিক্ষা সমস্যা’ প্রবন্ধে শিক্ষা নিয়ে বলেছিলেন, ‘শিখিবার কালে, বাড়িয়া উঠিবার সময়ে, প্রকৃতির সহায়তা নিতান্তই চাই। গাছপালা, স্বচ্ছ আকাশ, মুক্ত বায়ু, নির্মল জলাশয়, উদার দৃশ্য-ইহারা বেঞ্চি এবং বোর্ড, পুঁথি এবং পরীক্ষার থেকে কম আবশ্যক নয়।”
আমার খুব প্রিয় নচিকেতার একটা গানের লিরিক্স দিয়ে শেষ করি-
“ভিড় করে ইমারত আকাশটা ঢেকে দিয়ে
চুরি করে নিয়ে যায় বিকেলের সোনারোদ
ছোট ছোট শিশুদের শৈশব চুরি করে গ্রন্থকীটের দল বানায় নির্বোধ।”

30 Shares