শত বছরের জাদুঘর

0 Shares

আলী ইউনুস হৃদয়

শত বছরের পুরনো ঐতিহ্য বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। তবে শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক কিংবা দর্শনার্থীদের কাছে পরিচিত বরেন্দ্র জাদুঘর নামে । রাজশাহী নগরীর হেতেম খাঁ এলাকায় অবস্থিত এই জাদুঘরের ভবন চোখে পড়লেই মনে হবে এ যেন স্থাপত্যের অনবদ্য শৈলীর কারুকাজ। দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্নতত্ত্বের সংগ্রহশালা গুলোর মধ্যে এ জাদুঘর অন্যতম। শুধু সংগ্রশালা হিসেবেই নয় একইসঙ্গে প্রাচীন ইতিহাস গবেষণায় অবদান রেখে চলেছে এই জাদুঘর।

১৯১০ সালে বাংলার পুরনো ঐতিহ্য ও নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য ‘বরেন্দ্র অনুসন্ধান সমিতি’ গঠন করা হয়। এ সমিতি রাজশাহীর বিভিন্ন স্থানে অনুসন্ধান চালিয়ে কালো পাথরের বিখ্যাত গঙ্গা মূর্তিসহ পুরাতত্ত্বের ৩২টি নিদর্শন খুঁজে পায়। একপর্যায়ে নাটোরের দিঘাপাতিয়ার জমিদার শরৎকুমার রায়ের দান করা জমিতে জাদুঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়। খ্যাতনামা আইনজীবী ঐতিহাসিক অক্ষয় কুমার মৈত্রেয় এবং রাজশাহী কলেজিয়েট স্কুলের শিক্ষক রমাপ্রসাদ চন্দ্রের প্রচেষ্টায় এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯১৩ সালের ১০ নভেম্বর বাংলার তৎকালীন গভর্নর কারমাইকেল জাদুঘরটি উদ্বোধন করেন।
প্রত্নসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য শরৎকুমার মাসে ২০০ টাকা প্রদানের ব্যবস্থা করেন। ১৮৬০ সালের ভারতীয় সমিতি আইন অনুযায়ী ১৯১৪ সালে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর নিবন্ধন লাভ করে। শরৎকুমার নিজ ব্যয়ে তাঁর বড় ভাই দিঘাপতিয়ার রাজা প্রমদানাথ রায়ের দানকৃত জমির উপর জাদুঘরের জন্য ভবন নির্মাণ করেন। ১৯১৬ সালের ১৩ নভেম্বর লর্ড কারমাইকেল নতুন ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯১৯ সালের ২৭ নভেম্বর বাংলার আরেক গভর্নর লর্ড রোনাল্ডসে এটি উদ্বোধন করেন। ১৯১০ সালের এপ্রিল মাসে প্রমদানাথের উঠানে বরেন্দ্র জাদুঘরের প্রদর্শনী শুরু হলেও সরকারিভাবে ১৯১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বরকে বরেন্দ্র জাদুঘরের প্রতিষ্ঠা দিবস ধরা হয়।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের পরে জাদুঘরটির অস্তিত্ব নিয়ে সংকট দেখা দেয়। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত জাদুঘর ভবনটির অর্ধেকাংশ মেডিকেল স্কুল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে জাদুঘরটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে ওই বছরের ১০ অক্টোবর এর স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই পরিচালিত হচ্ছে এই জাদুঘরটি। বাংলাদেশের প্রাচীন ও প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক এই জাদুঘর বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক কোষাগার হিসেবে পরিচিত।

বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের সংগ্রহের সংখ্যা ৯০০০ এর অধিক। এখানে আছে হাজার বছরের পুরনো সিন্ধু সভ্যতার নিদর্শন, মহেঞ্জোদারো সভ্যতা থেকে সংগৃহীত প্রত্নতত্ত্ব, পাথরের মূর্তি, ভৈরব মূর্তি, কৃষ্ণ পাথরের তৈরী কালী মূর্তি, মাথা ভাঙা বিষ্ণু মূর্তি, গঙ্গা মূর্তিসহ অসংখ্য মূর্তি, প্রাচীন অষ্টাদশ শতকের পান্ডুলিপি, শের শাহের আমলের কামান এবং পর্তুগীজ আমলের বন্দুক, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারত বর্ষে প্রচলিত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মুদ্রা, মৌর্য, মুঘল ও সুলতানি আমলের রৌপ মুদ্রা, প্রাচীন কালের যুদ্ধাস্ত্র এবং জাতীয় নেতা শহীদ এএইচএম কামারুজ্জামানের স্মৃতি নিদর্শন।

বৌদ্ধ গ্যালারিতে পঞ্চম শতাব্দীর একটি বেলে পাথরের মূর্তি রয়েছে। এই মূর্তি বাংলাদেশ চারটি রয়েছে। এখানে ৩য় ও ৫ম শতাব্দীর হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি রয়েছে। জাদুঘরে বিভিন্ন যুগের প্রায় ৬ হাজার মুদ্রা রয়েছে যার মধ্যে স্বর্ণমুদ্রা ৩৮টি। মুদ্রাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা মৌর্য আমলের। জাদুঘরের অন্যতম আকষর্ণীয় এক প্রতœবস্তু হল চার হাজার বছর আগের মঞ্জুরী স্বর্ণমূর্তি।

আবার এই জাদুঘরে দেখা মিলবে, সিন্ধু সভ্যতার প্রত্নসম্পদ, বাংলাদেশের পাহাড়পুরের (৮ম-১২শ শতক) প্রত্নসম্পদ, ফারসি ফরমান ও বাংলার দলিলপত্র, পুরানো বাংলা হরফে সংস্কৃত লিপিসমূহ, চকচকে টালিসমূহ, ইসলামি রীতির ধাতব-তৈজসপত্র, হাতে লেখা কুরআন শরীফ, বাংলা ও সংস্কৃত পান্ডুলিপি, মোঘল সাম্রাজ্যের চিত্রকলা, পাথর ও ব্রোঞ্জ নির্মিত বিভিন্ন ভাস্কর্য, বিহারের নালন্দা এবং ভারতের অন্যান্য স্থান থেকে প্রাপ্ত প্রাচীন নিদর্শনাবলী।

জাদুঘরের দুই নম্বর গ্যালারিতে আছে, বৌদ্ধ ও হিন্দু দেবদেবীর প্রস্তর মূর্তি এবং কাঠের আধুনিক ভাস্কর্যসমূহ। তিন নম্বর গ্যালারিতে রয়েছে বেশ কয়েকটি সূর্য মূর্তি, শিব মূর্তি, গণেশ মূর্তি এবং বিষ্ণু মূর্তি। চার নম্বর গ্যালারিতে সাজানো রয়েছে দুর্গা-গৌরী-উমা-পার্বতী, মাতৃকা ও চামুন্ডা মূর্তি। পাঁচ নম্বর গ্যালারীতে আছে বৌদ্ধ মূর্তি, জৈন তীর্থঙ্কর এবং হিন্দুধর্মের গৌণ দেব-দেবীর মূর্তি।

ছয় নম্বর গ্যালারীতে দেখা মিলবে আরবি, ফারসি, সংস্কৃত এবং প্রাচীন বাংলার প্রস্তর লিপিসমূহ, মুসলিম যুগের খোদিত পাথর, মেহরাব, অলঙ্কৃত চৌ-কাঠ এবং শেরশাহের আমলের কামান। সাত নম্বর গ্যালারিতে আছে বিভিন্ন আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিদর্শন। এছাড়া বারান্দার উপরের সারিতে পাহাড়পুর থেকে প্রাপ্ত পোড়ামাটির ফলক সাজানো রয়েছে। নিচের সারিতে রয়েছে হিন্দু-বৌদ্ধ ভাস্কর্য। পুরো জাদুঘর প্রাঙ্গণ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন স্থাপত্য নিদর্শন, খোদাইকৃত পাথর ও পাথরের স্তম্ভ।

জাদুঘরে প্রতিদিন গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ জন দর্শনার্থী আসেন। বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছুটির দিনগুলোতে জাদুঘরটি বন্ধ থাকে। এছাড়া জাদুঘরের সময়সূচি তিনভাগে বিভক্ত। অর্থাৎ গ্রীষ্মকালীন সময় এপ্রিলের ১ তারিখ থেকে অক্টোবরের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে পাঁচটা পর্যন্ত। শীতকালীন সময় নভেম্বরের ১ তারিখ থেকে মার্চের ৩১ তারিখ পর্যন্ত সকাল ১০টা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত এবং রমজানের সময় সকাল নয়টা থেকে বিকাল তিনটা পর্যন্ত জাদুঘর দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে।

মেয়েকে নিয়ে জাদুঘরে এসেছেন সঞ্জীব চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রত্নতত্ত্বের যে সংগ্রহ আছে, বিশেষ করে পাথরের মূর্তিসহ আগের দিনে রাজা বাদশাহরা যেসব জিনিসপত্র ব্যবহার করতেন সেগুলো তরুণ প্রজন্মের ছেলে-মেয়েদের জানা উচিত। বাঙালির দীর্ঘদিনের সংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে হবে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী মিরা বললেন, রাজশাহীতে দুই বছর আছি। কিন্তু প্রথমবার বরেন্দ্র জাদুঘরে এলাম। এর আগে বইয়ে পড়েছি। এখন দেখে খুব ভালো লাগছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হোসনে আরা খানমের সঙ্গে কথা হয়। তিনি বললেন, দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম জাদুঘর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর। এই জাদুঘর ইতিহাস, সাহিত্য, প্রতœতত্ত্ব সবকিছুর সুবিশাল পরিচিতি বহন করে। ইতিহাসের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ছাড়াও সাহিত্যের, প্রতœতত্ত্বের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক পড়াশোনার জন্যও অনেক গুরুত্বপূর্ণ এই জাদুঘর। তবে মুক্তিযুদ্ধের ওপর উল্লেখযোগ্য কোন সংগ্রহ জাদুঘরে নেই। এছাড়া জাদুঘরে যে গ্রন্থাগারটি রয়েছে সেখানে থাকা বইগুলোর বেহাল দশা! এগুলো সংরক্ষণ করতে হবে। এই বইগুলো দুর্লভ একইসঙ্গে গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই জাদুঘরে সংরক্ষিত সবকিছুর রক্ষণাবেক্ষণ সঠিকভাবে করতে হবে।
আব্দুল কুদ্দুস বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের উপ-প্রধান সংরক্ষণ কর্মকর্তা। জাদুঘরে ঘুরতে ঘুরতে এই কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয়। আব্দুল কুদ্দুস বললেন, প্রাচীন রাজা বাদশাদের ব্যবহৃত প্রত্নতাত্ত্বিক বিভিন্ন নিদর্শন এখানে খুব যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি অতীত সম্পর্কে না জানতে পারে তবে সে তার অতীতকে ভালোবাসবে না। এসব ইতিহাস-ঐতিহ্যের নিদর্শন শিক্ষক-শিক্ষার্থী, গবেষক সকলের দেখতে হবে এবং অতীতের শেকড় সন্ধান করা উচিত।
জানতে চেয়েছিলাম সংগ্রহের কাজ এখনও হয় কিনা? তিনি বলেন, সংগ্রহের কাজ আমাদের চলছে। বিভিন্ন সময়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। যখনই মানুষ বা গণমাধ্যমের সাহায্যে প্রত্নসম্পদের সন্ধান পেলে সংরক্ষণের চেষ্টা করা হয়।

0 Shares