পটচিত্র : বিলুপ্ত প্রায় দেশীয় শিল্প

1 Shares

লুফাইয়্যা শাম্মীঃ
গ্রাম বাংলার লোকজ ঐতিহ্যের অন্যতম আকর্ষণ পটচিত্র। পটচিত্রের শুরু কবে তার সঠিক সময়কাল জানা সম্ভব হয়নি। অনুমান করা হয় পটচিত্রের ইতিহাস হাজার বছরের পুরোনো। পট এর আভিধানিক অথর্ -বস্ত্র, যা সংস্কৃত ‘পট্ট’ শব্দ থেকে এসেছে। লম্বা কাপড়ে দীর্ঘ রেখা টেনে ছবি আঁকাই হচ্ছে পটচিত্র। পটচিত্র আঁকার কাজে ব্যবহৃত হত দেশজ রঙ এবং মোটা কাপড়। তবে, কাপড়ে পটচিত্র আঁকার প্রচলন কমে যায় কাগজ আবিষ্কারের পর থেকেই। পট চিত্রশিল্পীদের ডাকা হয় ‘পটুয়া’ নামে। তাঁরা যে শুধু চিত্রশিল্পীই তা নয়, তাঁরা চিত্র প্রদর্শনীর সময় সুরে সুরে গানে গানে কাহিনী বিবরণ করেন।

পটচিত্রের সময় যে গান গাওয়া হয় তা ‘পটের গান’ নামে পরিচিত। ‘পটুয়া’রা সাধারণত মাপকাঠি কিংবা মডেল সামনে বসিয়ে নিয়ম-রীতি মেনে ছবি আঁকেন না। দীর্ঘ রেখা টেনে কাহিনী চিত্রায়িত করেন নিজেদের মতো করে। শিল্প-সমোঝদারদের কাছে গুরুত্ব পায়নি এই পটচিত্র। পটচিত্রের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য কিংবা স্বকীয়তা রয়েছে। রেখা টানার সময় সেখানে কোনো অনুভূতি প্রকাশের প্রয়োজন মনে করেন না, বিভিন্ন রকমের অবয়ব এঁকে গল্প সাজান ধারাবাহিকভাবে।পটচিত্রগুলো সুনিপুণ হয় না। কারণ, সাধারণ কয়েক ধাপে আঁকা হয়। প্রথমে চিত্রকর অবয়ব আঁকেন, তারপর মহিলারা রং ঢালাই করেন। এভাবে একসাথে প্রায় দেড়শো-দুইশো পট এঁকে ফেলেন তাঁরা। যে কারণে খুব সূক্ষ্মতম ছবি আঁকার ক্ষেত্রে পটুয়ারা অনভ্যস্ত। তাঁরা তাঁদের ছবিতে বিভিন্ন গল্প সাজানোকে প্রধান কাজ মনে করেন। পটচিত্র অঙ্কনের জন্যে লোকজ কাহিনী, পৌরাণিক কাহিনী, কিংবা দীর্ঘ কোনো গল্পের প্রয়োজন হয়। পটুয়াদের রয়েছে সীমাহীন ধৈর্যশক্তি, তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে, হাতে প্যাঁচানো পটচিত্র একটা একটা করে খুলে কাহিনী বর্ণনা করেন সুরে সুরে।


সবচেয়ে প্রচলিত দুইটি পটচিত্র হচ্ছে- কালিঘাট পটচিত্র ও গাজীর পটচিত্র। প্রথম দিকে পটচিত্র ছিল ধর্মীয় জ্ঞানসমৃদ্ধ। পটুয়ারা বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে ঘুরে পটচিত্র দেখিয়ে গল্প বর্ণনা করার সাথে সাথে নীতিকথাও বর্ণনা করতেন। ধীরে ধীরে পটচিত্রের প্লাটফর্মে পরিবর্তন আসে। লোকবিশ্বাস-রূপকথা-কুসংস্কার মিশে যায় পটুয়াদের মাঝে। যার কারণে, নারীচিত্র উপস্থাপন হতো অশ্লীল ভঙ্গীতে। কালিঘাটের পটচিত্রে এর কিছু প্রমাণ মিলে জায়গায় জায়গায়। আনন্দের খোরাক জোগাতে বিভিন্ন রাজা-রাণীর কাহিনী, দস্যু কাহিনী, লৌকিক গাঁথা পটুয়ারা দেখিয়ে বেড়াতো এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে। মূলত, এটা ছিল মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় পটচিত্র ছিল গাজীর পট। এখানে বিধৃত হয়েছে বিজয় গাথা। গাজীর পট ছিল ইসলামভিত্তিক পটচিত্র, তবে কোনো কোনো জায়গায় গাজীকে বাঘের দেবতা রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। ধীরে ধীরে আধুনিকতার ছোঁয়ায় এবং উচ্চমানের শিল্পকলায় পটচিত্র পিছনে পরে যায়। বিনোদনের বিভিন্ন আকর্ষনীয় মাধ্যমের কারণে মানুষ ভুলে যেতে থাকে পটচিত্রের কথা। বাংলার লোকসংস্কৃতির অন্যতম এই পটচিত্র বর্তমানে ধুঁকে ধুঁকে বেঁচে আছে। এখনো কিছু এলাকায়, পটুয়াদের বংশধর, পারিবারিক ঐতিহ্য চর্চায় এঁকে চলেছেন পটচিত্র। হাজার বছরের দেশীয় ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায় সেদিকে নজর দিতে হবে আমাদের শিল্পীসমাজকেই। বেঁচে থাকুক পটশিল্প- শিল্পীর তুলির আঁচরে, মননে, গল্প ও গানে।

1 Shares