স্মৃতির পাতায় ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের দিনলিপি

ওয়াকিলা তাবাসসুম মুমু

জীবনের সংজ্ঞা একেক রকম। তাই একেকটা জীবনের মূল্যায়ন করার মাপকাঠিও আলাদা।ডিকশনারির পাতা উল্টাতে উল্টাতে চোখে পড়লো, (C) দিয়ে একটি শব্দ, (Campus)।যার আক্ষরিক অর্থ- বিদ্যায়তন। ‘বিদ্যা’ যোগ ‘আয়তন’। যে আয়তনের অধীনে থেকে গড়ে উঠে আমাদের শিক্ষা, আমাদের মূল্যবোধ।ডিকশনারি হতে চোখ টা সরালাম।আপনাতেই বন্ধ হয়ে গেলো।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি। কোনোমতে রেডি হই যদিও চোখে কাজল টা দিতে ভুল হয়না।লিফটের লম্বা লাইনে দিন শুরু । এক লিফট এ নানা প্রজাতির ছাত্রছাত্রী। কেউ হয়তো আতেল গ্রুপের সদস্য কেউ হয়তো মেকাপ আরটিস্ট, কেউকেউ দুটোতেই এক্সপার্ট। ক্লাসে ঢুকে একগাদা নোটিশ, কোনোদিন কুইজ কোনোদিন মিড, প্রেজেন্টেশন গ্রুপ ওয়ার্ক, এসাইনমেন্ট, টার্ম পেপার, ল্যাব, কনসালটেশন, সারাদিন ক্লাস শেষে সন্ধ্যে নামার মুখে আবার শুরু ক্লাবের কাজ।হাফ ছাড়ার ফুসরত মেলেনা।
এক ফাকে চলে যাই ক্যান্টিন এ।চা সিংগারা বা কফি রোল, এ টেবিল হতে ও টেবিল। মাঝেমাঝে ঢুঁ মারা হয় বটতলার ৪০ টাকার ডিম খিচুরি খেতে বা ৬০ টাকার চিলিচিকেন তারপর চলে টং এর দোকানে ঝর লুটোপুটি গল্প চুরির। আর হঠাৎ চোখাচোখিতে মন চুরির দায় পরে অনেকের।যে চোখে মন আটকা পরে সে চোখ কে খোঁজার জন্য চলে তল্লাশি, গঠিত হয় স্পেশাল ফোর্স। দেখা যায় লাইব্রেরিতে কোন এক কোনে হাজারো বই এর ভীরে দৃষ্টি নিবিদ্ধ হয়ে আছে হিস্ট্রি এর কোন এক পাতায়।লাইব্রেরীর লবিতে ব্যাগ জমা দিতে দিতে আবার যেন ভুমিকম্প হয় দুজোরা চোখের আড়ালে, এবার কে নেবে কার দায়?এরপর দেখা যাবে স্টাডিরুমে পাশাপাশি। পাশের টেবিলেই একের পর এক বিজনেস কম্পিটিশন জেতা একটা ছেলে, ওয়ার্ক এক্সপেরিয়েন্স, সাফল্য আরো কত তবু চোখের দিকে তাকালে টের পাওয়া যাচ্ছে একরাশ হতাশা।ঠিক তার সামনের টেবিলেই দুবেনী করা গল্পের বই এ মুখ গোজা এক গোমরামুখী মেয়ে।মাথায় হাজার চিন্তা দেখলেই বোঝা যায় জয়ের তালিকায় প্রথমেই তার নাম।

এভাবেই চলে যেতে থাকে জীবন।ঝরে পরা প্রানগুলো ও জেগে উঠে ক্যাম্পাসের নতুন সাজে, প্রতিটি পালা পার্বনে প্রতিটি ক্লাব ফেয়ারে।এত এত অভিযোগ ধুলোয় মিশে যায়, সবচেয়ে কম সিজিপিএধারীও গা ঝারা দিয়ে উঠে সেমিনারে নতুন স্বপ্ন দেখে।হ্যা এমনটিই ব্র্যাক ইউনিভারসিটির শিক্ষার্থীদের গল্প। ব্র‍্যাক ইউনিভারসিটি এর ছাত্রছাত্রীরা তাদের একটা জীবন ফেলে আসে সাভারের একটা গ্রামে, তিন মাস থাকতে হয় সেখানে, মা-বাবা আর সব শখ আহ্লাদ কে ছেড়ে।একে বলে টার্ক (ট্রেইনিং এন্ড রিসোর্স সেন্টার)।এখানে দিন শুরু হয় জাতীয় সংগীত দিয়ে আর শেষ হয় রাত ১০-১১ টায় হোস্টেলের মিটিং এ। ছায়াঘেরা সবুজ দুটি মাঠ দুরবার আর দুরন্ত, টেবিল্ টেনিস আর আর গল্প আড্ডার আনন্দপুর,সুরভি তুষ্টি সুগন্ধা ডাইনিং অন্নেষা একাডেমিক বিল্ডিং, শাল্লার ৪-৫ ঘন্টার সেমিনার, ফুটবল ক্রিকেট ম্যাচ,ড্রামা,মুভি টাইম,ফরমাল ডে,এক্সট্রা এক্টিভিটি ক্লাস,লালবাগ -স্মৃতিসৌধ ভ্রমন, ব্র‍্যাক ভিজিট, সোশাল লারনিং ল্যাব,আর ফুলে ফুলে ঘেরা আবেগের মূর্ছনা।
এভাবেই কেটে যাবে ৪ টি বছর। চোখ খুললাম। একি, চা তো ঠান্ডাই হয়ে গেলো!এভাবেই একদিন বুড়ো হয়ে যাবো। জমবে ধুলো,ঠান্ডা হবে আরো কত কাপ চা। ঝাপসা হতে থাকবে মায়ার ক্যাম্পাস নিজের চোখ, যে ক্যাম্পাস এ চোখ কে একদিন স্বপ্ন দেখিয়েছিলো।

21 Shares