স্কলারশিপ নিয়ে যেতে চাইলে বিদেশ… (১ম পর্ব)

আরাফাত নোমান*

আমাদের সবার মনেই বিদেশে পড়তে যাওয়ার সুপ্ত কিন্তু তীব্র আকাঙ্ক্ষা কাজ করে। বিদেশে পড়ার ক্ষেত্রে খরচের ব্যাপারটা মাথায় আসে বলেই আমরা অনেকেই চাই বৃত্তি বা স্কলারশিপ এর ব্যাপারে খোঁজ নিতে। পুরো প্রক্রিয়াটি অনেক বিশদ হওয়ায় আমার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতা থেকে আমি চেষ্টা করবো আমার শিক্ষার্থীদের কিছুটা জানানোর। আমার লেখাটা ৪টি পর্বে থাকবে। আজ প্রথম পর্ব। আজকে আমি আলোচনা করবো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বিদেশে পড়তে যাওয়ার স্কলারশিপ নিয়ে। পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে এপ্লাই করার প্রক্রিয়া, ক্রেডিট ট্রান্সফার, বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন-হাউস স্কলারশিপ ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা করবো।

১। কমনওয়েলথ স্কলারশিপঃ যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি এটি। অত্যন্ত সম্মানজনক এবং সেইসাথে খুবই প্রতিযোগিতামূলক। সাধারণত যারা শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত থাকেন তারা এটা পেয়ে থাকেন, তবে শিক্ষকই হতে হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আপনার বয়স ৪০ এর কম হলে এবং আপনার ব্যাচেলর ডিগ্রিতে ৬০% বা ততোধিক নম্বর থাকলেই আপনি এই স্কলারশিপের জন্য এপ্লাই করতে পারবেন। এক্ষেত্রে যেটা লাগবে সেটা হলো যুক্তরাজ্যের কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে (অবশ্যই সেটা কমনওয়েলথ স্কলারশিপের আওতায় হতে হবে, গুগল করলেই লিস্ট পাবেন ব্রিটেনের কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় কমনওয়েলথের আওতায় আছে) ভর্তির আনকন্ডিশনাল অফার লেটার। তার মানে আপনার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ে ওদের নিজস্ব সিস্টেমে এপ্লাই করতে হবে আর অফার লেটার পেলেই আপনি কমনওয়েলথের জন্য এপ্লাই করতে পারবেন। দুটোর ক্ষেত্রেই এপ্লিকেশন প্রোসেস ভিন্ন (এ ব্যাপারে পরবর্তী লেখায় বিশদ বলা হবে)।

কমনওয়েলথ কিংবা যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এপ্লাই করতে গেলে আপনার IELTS দেওয়া লাগবে। IELTS এর স্কোর অবশ্যই ৭ বা এর উপর রাখা উচিৎ যদি আপনি ভালো র‍্যাংকিং এর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চান। এছাড়া স্কলারশিপের ক্ষেত্রেও আইল্টসের স্কোর আপনার জন্য একটা ফ্যাক্টর হবে। (কমনওয়েলথ সাধারণত ওপেন হয় নভেম্বরের দিকে। সময় থাকে ২ মাসের মতো।

লিংকঃ http://cscuk.dfid.gov.uk/apply/masters-scholarships/

২। কমনওয়েলথ শেয়ারড প্রোগ্রামঃ এটাও কমনওয়েলথের মতই কিন্তু এটার ফাণ্ডিং অর্ধেক যেই বিশ্ববিদ্যালয় এফিলিয়েটেড সেটা দিবে আর বাকি অর্ধেক দিবে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ কমিটি। বাকিসব ক্রাইটেরিয়া একই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা তালিকা থাকে যে কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় এই শেয়ারড প্রোগ্রামের আওতায়। লিংকঃ http://cscuk.dfid.gov.uk/apply/shared-scholarships/

৩। শেভেনিং স্কলারশিপঃ এটাও যুক্তরাজ্যে পড়তে যাওয়ার জন্য ব্রিটিশ সরকারের বৃত্তি। সাধারণত এনজিও কর্মী, সরকারী চাকুরে, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা এদের জন্য এই বৃত্তি। আপনার চাকরি যদি দুই বছর হয় তাহলে এটার জন্য এপ্লাই করতে পারবেন। ক্রাইটেরিয়া একই রকম। আইল্টসে ভালো স্কোর আর ইউকের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আনকন্ডিশনাল অফার লেটার লাগবে।

৪। ফুলব্রাইট স্কলারশিপঃ মার্কিন সরকারের বৃত্তি। দারুণ প্রেস্টিজিয়াস এবং আর্থিক দিক থেকেও বেশ লাভজনক। মূল বৃত্তিটির নাম হলো ফুলব্রাইট ফরেন স্টুডেন্ট প্রোগ্রাম। এটার ক্ষেত্রে আলাদাভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এপ্লাই করতে হবেনা। ফুলব্রাইটে এপ্লাই করলেই হবে। যদি আপনি বৃত্তির জন্য মনোনীত হোন তাহলে তারাই আপনাকে বিশ্ববিদ্যালয় নির্ধারণ করে দিবে। ফুলব্রাইটের ক্ষেত্রে আপনার GRE (Graduate Record Examination) দিতে হবে। জিআরই পরীক্ষা হয় ৩৪০ এর উপরে; ১৭০ অ্যানালিটিক্যাল (মূলত গণিত) আর ১৭০ ভার্বাল (মূলত ইংরেজি ভাষার দক্ষতা নিরূপণ) এবং এনালিটিক্যাল রাইটিং অ্যাবিলিটি এর উপর। জিআরই বিষয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা হবে। আপনাকে টোফেল বা আইল্টসও দিতে হবে। টোফেল দিলে সেটাকে আইল্টস স্কোরে কনভার্ট করা যায় আবার আইল্টস দিলেও সেটা টোফেলে কনভার্ট হয়। ফুলব্রাইটের জন্য
Commonwealth Master’s Scholarships | Commonwealth Scholarship Commission in the UK
Commonwealth Master’s Scholarships are for candidates from low and middle income Commonwealth countries, for full-time Master’s study at a UK university. cscuk.dfid.gov.uk

৫। ইরেসমাস মুন্দুস জয়েন্ট স্কলারশিপ প্রোগ্রামঃ ইউরোপ ঘুরে বেড়ানোর জন্য এর চাইতে ভালো স্কলারশিপ আর হয়না। বিশেষ করে সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে যারা পড়ছেন তাদের জন্য এটা বেশ লিউক্রেটিভ। সিজিপিএ ভালো থাকতে হবে; ৩.৫ এর উপর থাকা লাগবে। এই স্কলারশিপের মজা হলো ওরা আপনাকে ইউরোপের  দেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌথভাবে দুই বছরের মাস্টার্স ডিগ্রি করাবে। বৃত্তির পরিমাণ বেশ ভালো। কোনো চাকরির অভিজ্ঞতা লাগবেনা।

লিংকঃ https://ec.europa.eu/programmes/erasmus-plus/opportunities/individuals/students/erasmus-mundus-joint-master-degrees_en

৬। OFID (OPEC Fund for International Development) স্কলারশিপঃ ৫০০ র‍্যাংকিং এর মধ্যে বিশ্বের যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপনি আনকন্ডিশনাল অফার লেটার পেলে আপনি এটায় এপ্লাই করতে পারবেন। আইল্টস দেওয়া লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয় অফার পাওয়ার পর আলদাভাবে এপ্লাই করতে হবে। সাধারণত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে ওপেন হয়ে এপ্রিল পর্যন্ত সময় থাকে।

লিংকঃ http://www.ofid.org/Beyond-the-scope-N1/Scholarship-Award-N1/Application-Guidlines

৭। আগা খান স্কলারশিপঃ বিশ্বের ভালো র‍্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অফার লেটার নিয়ে এই স্কলারশিপে এপ্লাই করতে হয়। সাধারণত উন্নয়ন বিষয়ক পড়ালেখার জন্য এই বৃত্তি দেওয়া হয়। এক্সিলেন্ট একাডেমিক রেকর্ড থাকা লাগবে এবং আইল্টস জিআরই তেও ভালো স্কোর (৩১০+) থাকা লাগবে।

লিংকঃ https://www.akdn.org/our-agencies/aga-khan-foundation/international-scholarship-programme

৮। অস্ট্রেলিয়ান অ্যাওয়ার্ড বা AUSAiD স্কলারশিপঃ অস্ট্রেলিয়া সরকারের বৃত্তি। দুই বছরের মাস্টার্স প্রোগ্রামের জন্য এই বৃত্তি দেওয়া হয়। মূলত এনজিও কর্মী, সরকারি চাকুরে, ব্যাংকে যারা কাজ করছেন তাদের চাকরির বয়স ৪ বছর হলে এটা তে আবেদন করতে পারবেন। আইল্টস লাগবে। আলাদা করে অস্ট্রেলিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের প্রয়োজন নেই। এটা ওপেন হয় জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির দিকে। সময় থাকে এপ্রিল পর্যন্ত।

এবার আসি সিজিপিএ ছাড়াও কী লাগবেঃ

* ভালো সিজিপিএ না থাকলেও আপনার লাগবে দুর্দান্ত একটা SOP (Statement of Purpose)। SOP হলো আপনি কেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চাচ্ছেন বা আপনাকে কেন এই বৃত্তি দেওয়া হবে বা আপনার কী কী কোয়ালিটি আছে এ বিষয়ে ন্যূনতম ১০০০-১৫০০ শব্দের মধ্যে একটা লেখা। এখানেই আপনার এক্সট্রা-কারিকুলার বা লিডারশিপের প্রোগ্রামগুলো কাজে লাগবে। এছাড়া আপনার ব্যক্তিগত কোনো উদ্যোগ মানুষের কোনোভাবে কাজে লাগছে কিনা বা আপনার পাবলিকেশন আছে কিনা এগুলো বলতে হবে SOP-তে। SOP নিয়ে কারো আগ্রহ থাকলে কথা বলা যাবে বিস্তারিত।

*সিভিঃ দারুণ একটা সিভি লাগবে। ফরম্যাট অনেকেই দিয়ে দেয় যেমন ইরেসমাসে আপনাকে সিভি ফরম্যাট ওরাই দিয়ে দিবে। বাকিগুলোর ক্ষেত্রে সিভি হবে সিম্পল কিন্তু বেশ ঝকঝকে। মিথ্যা কোনো ইনফরমেশন দেওয়া যাবেনা।

*রেফারেন্স লেটারঃ আপনার বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস সুপারভাইজর বা শিক্ষক বা আপনার কর্মক্ষেত্রের বস থেকে আপনার দুটো রেফারেন্স লেটার (ফুলব্রাইটের ক্ষেত্রে তিনটা লাগে) লাগবে। এ ক্ষেত্রে যে আপনাকে রেফারেন্স দিবে অর্থাৎ রেফারির যোগ্যতাও সেই লেভেলের হতে হবে। সে আপনার যোগ্যতা, দুর্বলতা এবং পোটেনশিয়াল সম্পর্কে জানবে। কাজেই রেফারি নির্বাচনের ক্ষেত্রে সতর্ক হোন এবং আগে থেকেই সুসম্পর্ক বজায় রাখুন (তেল মেরে নয়, নিজের যোগ্যতা দিয়ে সুসম্পর্ক বজায় রাখবেন)।

*একডেমিক সার্টিফিকেটের স্ক্যান্ড কপি

*পাসপোর্টের স্ক্যান্ড কপি

পর্ব-১ এই পর্যন্তই। মাথায় রাখবেন আপনাকে কেউ কিছু মুখে তুলে খাওয়াবে না। কষ্ট করতে হবে। নিজের সাথে প্রতিযোগিতা করতে হবে। শুভকামনা।(চলবে)

লেখকঃ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার অ্যান্ড এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট।