সুস্থ থাকার উপায় জানুন (৩০ পর্ব একসঙ্গে)

৥ নুরুন্নবীঃ

১। বাংলাদেশ হচ্ছে নানা জাতের শাক-সবজি, ফল-মুলের জন্য দুনিয়ার অন্যতম সেরা জায়গা, শাক-সবজিতে এত বৈচিত্র দুনিয়ার আর কোথাও আছে বলে অজানা। একটা মানুষের সুস্থতার জন্য তার দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় শাক-সবজি-ফল রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি এটা কিভাবে খেতে হবে সেটাও গুরুত্বপুর্ন। আমি অনেক বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে দেখেছি যে এমনভাবে করলাকে ভাজি করে যে করলা কালো হয়ে যায় অর্থ্যাৎ পোড়া পোড়া করে ভাজি করে। এভাবে কোন সবজিকে পোড়ানো স্বাস্হ্যসম্মত না; এটা সবজির পুস্টিগুন নষ্ট করে দেয়। পালং শাক, পুঁই শাক এগুলাও ভাজি করতে গিয়ে অনেকে কালো করে ফেলে। সবজি খাওয়ার পুরাপুরি সুবিধা তখনই পাওয়া যাবে যখন এটাকে যথাসম্ভব কম পোড়ানো হবে-সবজির সবুজ রংটা থাকতে থাকতেই চুলা থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে, আধা কাঁচা-আধা সিদ্ধ খাইতে পারলে সবচেয়ে ভাল।

২। রাতের খাবার দেরীতে খাওয়া এবং খাবারের পর পর ঘুমাতে যাওয়া বাংলাদেশের শহুরে মানুষজনের কাছে একটা ফ্যাশনে পরিনত হয়েছে, যেটা খুবই অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস। আপনি যদি রাত ১১ টায় ঘুমাতে যান সেক্ষেত্রে রাতের খাবারটা অন্তত ৮ টার সময় খেলে ফেলা দরকার। রাতের খাবার খাওয়ার পর আপনি এশার নামাজ পড়তে গেলেন, কিছুটা হাটাহাটি হলো, পরিশ্রম হলো, এর মাধ্যমে খাবারটা হজম হওয়ার সুযোগ তৈরি হইল। দ্বিতীয়ত রাতের খাবার পরিমানে কম খাওয়া দরকার কারন রাতে আমরা কোন ভারি কাজ করি না, শরীরের নড়াচড়াও কম হয়।

৩। আমরা কি খাই সেটা যেমন গুরুত্বপুর্ন তেমনি কিভাবে খাই সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ঠান্ডা-কাশি-সর্দি এসব জাতীয় রোগে পরিনত হয়েছে। অথচ ঠান্ডাজনিত রোগের সবচেয়ে বড় প্রতিষেধক হিসাবে কাজ করে আদা এবং রসুন কিন্তু যেহেতু আদা এবং রসুনকে আমরা তরকারিতে দিয়ে দীর্ঘসময় আগুনে পোড়াই ফলে আমরা এর সুবিধাগুলি খুব একটা পাই না। ঠান্ডাজনিত রোগের প্রতিরোধ ছাড়াও আদা-রসুনের আরো নানা ঔষুধি গুনাবলি আছে। কিভাবে খাবেন? কাচা আদা খাওয়ার অভ্যাস করতে পারেন অথবা রং চা তে দিয়ে কাচা আদা খেতে পারেন। আমি অনেক রেস্টুরেন্টে দেখেছি রান্না করা গোস্তের উপর বেশ কিছু কাচা আদা ছিটিয়ে দেয়-এটা ফলো করতে পারেন। আদার মত কাচা রসুনও খাওয়ার অভ্যাস করুন, কাচা খাইতে গন্ধ লাগলে আচারের সাথে মিশিয়ে খেতে পারেন, অথবা পুঁই শাক, পালং শাক কিংবা লাল শাক ভাজি করার সময় সেটা চুলা থেকে নামানোর পাঁচ মিনিট আগে কয়েকটা রসুনের কোষ দিয়ে দিবেন তারপর সেই রসুনের কোষ খাবেন তাহলে আর গন্ধটা লাগবে না।

ইংল্যান্ডের ফার্মেসীগুলাতে রসুনের পাউডার এবং আদার পাউডার কিনতে পাওয়া যায় এবং ট্যাবলেট আকারেও পাওয়া যায়। আবার আদাকে কিউবের মত করে একটু মিস্টি মিশিয়েও বিক্রি করে। যাইহোক ট্যাবলেট বানিয়ে খান আর কাচা খান এটাকে আপনার খাদ্য তালিকায় রাখুন এবং এই দুইটা শক্তিশালী হার্বকে আগুনে পোড়ানো থেকে রক্ষা করুন।

৪। ‘5-a-day’ বৃটেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হেলথ ক্যাম্পেইন। ফাইভ-এ-ডে ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে মানুষকে প্রতিদিন ৫ ধরনের ফল এবং সবজি খেতে উৎসাহিত করা হয়। নিজেকে সুস্হ্য রাখার জন্য প্রতিদিন ২ ধরনের ফল + ৩ ধরনের সবজি অথবা ৩ ধরনের ফল + ২ ধরনের সবজি মিলিয়ে মোট ৫ টা পোর্শন খাওয়া প্রয়োজন বলে স্বাস্হ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। 5-a-day আপনার শরীরের ভিটামিনের চাহিদা পুরন করবে এবং ভিটামিনের অভাবজনিত নানা রোগ থেকে মুক্ত রাখবে।

৫। অনেকেই বাচ্চাদেরকে বকাবকি করেন পড়াশুনা মনে রাখতে পারে না এই অভিযোগে। অনেক সময় বাচ্চারা দুষ্টামির কারনে পড়াশুনায় মনযোগী হয় না সেজন্য পারে না, আবার অনেক সময় ওমেগা-৩’র ঘাটতির কারনেও এমন হয়। সুতরাং ছেলে-মেয়েদেরকে মাছ খাওয়ানোর অভ্যাস করুন,  বিশেষ করে তৈলাক্ত মাছ, নানা ধরনের সামুদ্রিক মাছ, তাতে করে বাচ্চার স্মৃতিশক্তি ভাল হবে, হার্ট ভাল থাকবে। মনে রাখবেন গোস্তের তেল যতটা ক্ষতিকর মাছের তেল ততটাই উপকারি।

বাচ্চাদেরকে কোক-পেপসি সহ কোন ধরনের ফিজি ড্রিংক খাওয়াবেন না, যেসব খাবারে কালার / রং মিশানো থাকে সেসব খাবার খাওয়াবেন না; এসব খাবার বাচ্চাদেরকে হাইপার একটিভ করে তোলে। প্রসেস ফুড / রেডিমেইড ফুড যথাসম্ভব বাদ দিয়ে মায়ের হাতের রান্না খাওয়াবেন। প্রসেস ফুডে অতিরিক্ত লবন থাকে যেটা অস্বাস্থ্যকর। পুজিবাদের এই যুগে দেশি বিদেশি সব খাবারেই ভেজাল আছে, সবাই যে কোন মুল্যে মুনাফা করতে চায় এখন। সুতরাং নিজেদের হাতের তৈরি খাবারই তুলনামূলকভাবে নিরাপদ খাবার।

৬। বৃটেনের সাম্প্রতিক এক গবেষনায় দেখা গেছে আগে যেখানে দম্পতিরা মাসে গড়ে চার বার মিলিত হতেন তার পার্টনারের সাথে সেখানে এখন তারা মাসে দুইবার মিলিত হন। বিবিসি ওয়াল্ড সার্ভিসে দেয়া এক সাক্ষাতকারে গবেষক দাবী করেন সোশ্যাল মিডিয়ার কারনেই মুলত বৃটিশদের সেক্সুয়াল লাইফে এই পরিবর্তনে এসেছে। গবেষকের পরামর্শ হচ্ছে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় মোবাইলটা বেড রুম থেকে দুরে রাখতে,  তাতে করে পার্টনাররা আগের মত একে অপরের প্রতি মনযোগী হবে। সেক্সুয়াল হেলথের সাথে মেন্টাল হেলথের একটা সম্পর্ক আছে বিশেষ করে স্ট্রেস রিলিফের ক্ষেত্রে এটা উপকারি।

৭। বাংলাদেশে স্বাস্হ্য সচেতনতা বলতে মোটাদাগে ফলে ফরমালিন আর খাবারে ভেজাল এই দুইটা বিষয়কেই বিবেচনা করা হয় অথচ এর বাইরে স্বাস্হ্য সচেতনতার অনেক অনেক বিষয় আছে যেগুলা নিয়ে আমাদের মধ্যে তেমন একটা আলাপ-আলোচনা দেখা যায় না। একটা সময় ছিল যখন মানুষ এক / দেড় মাইল হেটে গিয়ে স্কুল করত, বাজার করত অথচ এখন হাতের নাগালেই রিকশা-সিএনজি-বাস, সামান্য একটু জায়গা কেউ হাটতে রাজী না। একটা সময় ছিল মানুষ হাতে কাপড় কাচত তাতে করে তার কিছুটা ব্যায়াম হয়ে যেত এখন ওয়াশিং ম্যাশিন আছে। আমরা ছোটবেলায় বিটিভি থেকে ইটিভি দেখতে গেলে বসা থেকে উঠে গিয়ে হাত দিয়ে চ্যানেল চ্যান্জ করা লাগত আর এখন শুয়ে শুয়ে রিমোর্ট দিয়ে চ্যানেল চ্যান্জ করা যায়। অর্থ্যাৎ নতুন নতুন টেকনলজি আসতেছে আর আমাদের আরাম বাড়তেছে অন্যদিকে এসব টেকনলজির নির্ভরতা আমাদের শরীরের মুভমেন্ট কমিয়ে দিচ্ছে। আর এই মুভমেন্ট কমে যাওয়ার খেসারত হিসাবে খুব অল্প বয়সেই কোলেস্টরাল সমস্যা-হার্টের সমস্যাসহ নানা অসুখ-বিসুখের মুখামুখি হচ্ছি আমরা। আমাদের বর্তমান এই মুভমেন্টহীন জীবন যাপনকে বলে Sedentary lifestyle. আমরা চাইলেই এসব টেকনলজিকে পুরাপুরি ইগনোর করতে পারব না তবে সেডেন্টারি লাইফস্ট্যাইল থেকে বের হওয়ার জন্য বিকল্প পথ খুজতে হবে যার যার পরিস্থিতি অনুযায়ী।

৮। সুস্থ্যতার দিক থেকে ইউরোপের মধ্যে যেসব দেশ সামনের সারিতে আছে তাদের মধ্যে হল্যান্ড অন্যতম। আর হল্যান্ডের এই সুস্থ্যতার রহস্য হচ্ছে সাইকেল চালানোর অভ্যাস। হল্যান্ডে সাইকেলের জন্য আলাদা রাস্তা করে দেয়া আছে এবং মানুষের মধ্যেও সাইকেল চালানোর প্রবনতা আছে। হল্যান্ডের দেখাদেখি ইংল্যান্ডও সাইকেল চালানোকে প্রমোট করে যাচ্ছে গত কয়েক বছর যাবত- বিভিন্ন রাস্তায় সাইকেলের জন্য আলাদা লেন করে দেয়া হয়েছে; বিভিন্ন ট্রেন স্টেশনের সামনে সাইকেল রাখার জন্য স্ট্যান্ড করে দেয়া হয়েছে। বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনও সাইকেলকে জনপ্রিয় করতে হয়ত আরো নানা উদ্যোগ নিবেন। তিনি লন্ডনের মেয়র থাকা অবস্থায় চাইকেল চালিয়েই অফিস করতে যেতেন। ঢাকা শহরে সাইকেল চালিয়ে অফিস করা হয়ত অসম্ভব কাজ তবে গ্রামে গন্জে কোন সমস্যা আছে বলে মনে হয় না, ঢাকা শহরে মেইন রোড বাদ দিয়ে গলির ভিতরে সাইকেল চালানো সম্ভব। মেয়েদের জন্য রশি / দড়ি দিয়ে লাফা খেলা একটা ভাল ব্যায়াম। সাইকেল চালানোর অভ্যাস গড়ে তুলুন, রশি দিয়ে লাফা খেলুন-সুস্থ্য থাকুন।

৯। সালাদ মানে শুধু ক্ষিরা আর টমেটো মিক্স করে খাওয়া না, যে কোন সবজি কাচা খাওয়াই সালাদ। প্রতিদিন না হোক অন্তত সপ্তাহে ২/৩ দিন সালাদ খাওয়ার অভ্যাস করুন। টমেটো, ক্ষিরা, মুলা, গাজর, লাউ, শষা, লেবু সহ যেসব সবজি কাচা খাওয়ার সুযোগ আছে সেগুলাকে সালাদ বানিয়ে খাওয়ার অভ্যাস করুন। এছাড়া দুই / তিন রকমের ফলকে মিক্স করে ফ্রুট সালাদও খাইতে পারেন।

১০। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে খালি পেটে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিবেন; আজকের জন্য এতটুকুই।

১১। সকালের নাস্তা আর রামাদানে ইফতারি দুইটার ক্ষেত্রেই একই নিয়ম প্রযোজ্য। ভাজা-পোড়া-খুব মশলাযুক্ত খাবার এভোয়েড করতে হবে। আপনি সারা রাত ফাস্ট (রোযা) করলেন তারপর সকালে সেটাকে ব্রেক করলেন / ভেঙ্গে ফেললেন অর্থ্যাৎ ব্রেকফাস্ট করলেন। প্রথমেই খালি পেটে দুই গ্লাস পানি খেয়ে নিলেন তারপর নাস্তা প্রস্তুত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। দুধ দিয়ে সিরিয়াল খাইতে পারেন কিংবা চিড়া ভেজা খাইলেন কিংবা পান্তা ভাত খাইলেন কিংবা রুটি দিয়ে কোন একটা সবজি খাইলেন। তবে রুটি দিয়ে আলু ভাজি খাইয়েন না কারন রুটি এবং আলু দুইটাই কার্বোহাইড্রেড জাতীয় খাবার। মনে করুন রুটি দিয়ে মুলা ভাজি খাইলেন কিংবা লাউ তরকারি দিয়ে খাইলেন অর্থ্যাৎ আপনার 5-a-day থেকে একটা সবজি খাওয়া হয়ে গেল, তারপর একটা কলা কিংবা অন্য কোন সিজনাল ফল খেয়ে নিলেন তাহলে আপনার দুইটা পোর্সন হয়ে গেল। দুপুরে ভাতের সাথে একটা সবজি খাইলেন আর লটকন / আমলকি / পেয়ারা কোন একটা ফল খাইলেন। তাহলে সকাল-দুপুর মিলিয়ে 5-a-day থেকে চারটা পোর্সন হয়ে যাবে আর রাতের খাবারে একটা পোর্সন খেয়ে নিলেই আপনার 5-a-day হয়ে যাবে।

ফলের ক্ষেত্রে সবসময় দেশীয় ফল খাবেন এবং সিজনাল ফল খাবেন। যেই সিজনে যেই ফলটা সবচেয়ে এভেইলেবল সেই ফলটা খাবেন। দামী ফল খাওয়ার দরকার নাই, দামে সস্তা ফল খাবেন তবে পরিমানে বেশি খাবেন। বাচ্চাদের নামের ক্ষেত্রে যেমন আনকমন নাম রাখার দরকার নাই তেমনি ফলের ক্ষেত্রে বেশি দাম দিয়ে আনকমন ফল কেনার দরকার নাই। কারো বাসায় দাওয়াত খাইতে গেলে আপেল-কমলা-আঙ্গুর না কিনে আম-কাঠাল-জাম্বুরা কিনে নিয়ে যাবেন।

 ১২। ঢাকাতে কিছু কিছু অফিসে আমি দেখেছি যে বসের গাড়ীটা অফিসের সামনে এসে থামল, তারপর ড্রাইভার দরজাটা খুলে দিল, পিয়ন এসে বসের হাত থেকে ছোট ব্রিফকেসটা নিয়ে নিল, লিফটম্যান বাটন প্রেস করে লিফট খুলে দিল, তারপর বস নিজের টেবিলে গিয়ে বসলেন। কি আয়েশী জীবন! এরা অনেক সময় এক গ্লাস পানি পর্যন্ত ঢেলে খায় না, পিয়নকে বললে পিয়ন পানি ঢেলে দেয়! এই সেডেন্টারি লাইফস্টাইলের ক্ষতিপূরণ তাকে দিতে হয় নানা রোগের মাধ্যমে। অনেক যৌথ ফ্যামিলিতে দেখা যায় মহিলারা কাজ নিয়ে ঠেলাঠেলি করেন কিভাবে কাজ একটু কম করবেন কিভাবে একটু আরামে থাকবেন অথচ কাজ করলে বডি মুভমেন্ট বেশি হবে, শরীরের উপকার হবে সেটা জানেন না। যারা জিমে যান কিংবা নিয়মিত ব্যায়াম করেন তাদের ঘরে বা অফিসে বডি মুভমেন্ট কম হইলে অসুবিধা নাই। কিন্তু যারা নিয়মিত ব্যায়াম করেন না তারা চেষ্টা করুন লিফটে না উঠে সিড়ি ব্যবহার করতে, কাছের দুরত্বে রিকশায় না উঠে হাটতে, পিয়নকে না ডেকে নিজেই পানি ঢেলে খাইতে, অফিসে কাজের ফাকে ফাকে একটু হাত পা নাড়তে-নিজের হাত দিয়ে পুরা শরীরটা একটু হালকা ম্যাসাজ করে নিতে তাতে করে একটু ব্লাড সার্কুলেশন হইল, মসজিদ থেকে ফেরার পথে একটু জগিং করতে করতে বাসায় ফিরলেন, মহিলাদের ক্ষেত্রে সব কাজ বুয়ার উপর চাপিয়ে না দিয়ে ভাগাভাগি করে কাজ করুন। এগুলা ব্যায়ামের বিকল্প না তবে কিছুটা কাজে দিবে।

 ১৩। মুখটাকে বন্ধ করে নাক দিয়ে লম্বা করে একটা নি:শ্বাস নিন, তারপর যতক্ষন সম্ভব সেটাকে ধরে রাখুন, এরপর খুব ধীর গতিতে মুখ দিয়ে বাতাসটাকে ছাড়তে থাকুন। এভাবে কয়েকবার প্র্যাকটিস করুন-এটা আপনার হার্টের ক্যাপাসিটি বাড়াবে। প্রতিদিন অল্প অল্প করে এই ব্যায়ামটা করুন।

 ১৪। কমলা-জাম্বুরা-লেবু এইগুলা হইল citrus জাতীয় ফল, ভিটামিন সি সমৃদ্ধ ফল। মানুষের শরীরে যেই ভিটামিনটা প্রতিদিন প্রয়োজন সেটা হল ভিটামিন সি। ভিটামিন সি যেমন ঠান্ডা এবং ঠান্ডাজনিত রোগ প্রতিরোধে কাজে লাগে তেমনি শরীরের ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে ভিটাসিন সি প্রয়োজন। যেহেতু কমলার দাম বেশি ফলে আপনি কমলার পরিবর্তে জাম্বুরা খাইতে পারেন, লেবু খাইতে পারেন। এছাড়া আমলকি, লটকন, আনারস, আম এবং টমেটোতে প্রচুর ভিটামিন সি আছে।

 ১৫। বাংলাদেশে যারা আছেন তারা হয়ত সুর্যের আলো কত দরকারী সেটা সেভাবে বুঝতে পারেন না কারন সুর্যের আলো দুস্প্রাপ্য কিছু না সেখানে। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলাতে যারা থাকেন তারা টের পান সুর্যের আলোর প্রয়োজনীয়তা। ইউরোপের দেশগুলাতে বছরের লম্বা সময় ধরে শীত থাকে এবং খুব একটা সুর্যের আলো থাকে না। সুর্যের আলো না থাকলে একদিকে যেমন মানুষ মনমরা হয়ে থাকে-ডিপ্রেশনে ভোগে অন্যদিকে ভিটামিন ডি এর ঘাটতি দেখা দেয়। অন্যদিকে সুর্যের আলো না থাকলে কৃষি কাজ হয় না। তবে ভিটামিন ডি এর ভাল দিক হচ্ছে এটা ভিটামিন সি এর মত প্রতিদিন দরকার হয় না। সেজন্য যেই সময়টাতে ইউরোপে সুর্যের আলো ভাল থাকে সে সময়ে ইউরোপে বসবাসরত বাঙ্গালী ভাই বোনেরা বেলকনিতে অথবা বাসার গার্ডেনে বসে যতটুকু সম্ভব হাত-পা-মুখ অনাবৃত রেখে সুর্যের আলো গ্রহন করতে পারেন। ভিটামিন ডি এর জন্য সুর্যের আলোটা সরাসরি চামড়তে লাগা দরকার। আর ৩/৪ মাস সুর্যের আলো গ্রহন করলে সেটা দিয়ে সারাবছরের ভিটামিন ডি হয়ে যাবে। এছাড়া দুধ, তৈলাক্ত মাছ এবং গোস্তে কিছুটা ভিটামিন ডি পাওয়া যায়। ইউরোপে যেসব বাঙ্গালী ভাই বোনেরা আছেন হলিডেতে গেলে পর্যাপ্ত সুর্যের আলো আছে এমন দেশে যাবেন।

 ১৬। গোস্ত-মাছ-ডাল এগুলা আমাদের শরীরে প্রোটিনের চাহিদা পুরন করে থাকে। ডাল বলতে শুধু মুশুরীর ডাল না-যে কোন ডাল হইতে পারে। বুটের ডাল, মটরশুটি, ছোলা, রেড কিডনি বিন, বাটার বিনসহ নানা জাতের ডাল খেতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের লোকেরা ছোলাকে পেস্ট করে হোমোস বানিয়ে খায় আবার ক্যারিবিয়ানরা ভাতের সাথে কিডনি বিন মিক্স করে রান্না করে-ট্রাই করে দেখতে পারেন। যাদের কলেস্টেরল সমস্যা আছে তারা গোস্তের পরিমান কমিয়ে মাছ এবং ডালের পরিমান বাড়িয়ে দিতে পারেন। মাছের ক্ষেত্রে তৈলাক্ত মাছকে গুরুত্ব দিবেন এবং যদি সম্ভব হয় মাঝে মাঝে সামুদ্রিক মাছ খাবেন। অনেককে দেখা যায় তিনি গোস্ত-মাছ-ডাল তিনটাই একসাথে খাচ্ছেন কিন্তু প্লেটে কোন সবজি নাই-এতে করে খাবারে ইমব্যালেন্স তৈরি হয়। মাছ-গোস্ত-ডাল এই তিনটা থেকে আপনার পছন্দ এবং সামর্থ অনুযায়ী একেক দিন একেকটা খান আর প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় সবজি রাখুন।

 ১৭। যইতুনের তেল / অলিভ অয়েল হার্টের জন্য অত্যন্ত উপকারি। সালাদের সাথে মিশিয়ে খাইতে পারেন। বাংলাদেশে পাওয়া যায় কি না আমার ধারনা নাই। অবশ্য কেউ কেউ জলপাই আর যইতুনকে একই মনে করে থাকেন। তবে ‘ছহিহ আকিদা’ অনুযায়ী যইতুন আলাদা ফল। কাচা অলিভও সালাদ হিসাবে খাইতে পারেন। অলিভের তেল রান্নায় ব্যবহারের জন্য এবং সালাদের সাথে ব্যবহারের জন্য আলাদা রকম পাওয়া যায়। চেষ্টা করবেন সালাদেরটা কিনতে এবং সবচেয়ে ভাল কোয়ালিটিরটার নাম হচ্ছে extra virgin olive oil. ফিলিস্তিন, তুরস্কসহ সমগ্র মেডিটোরিয়ান এলাকায় অলিভ এবং অলিভের তেল বেশ জনপ্রিয়।

 ১৮। অনেককে দেখা যায় ডায়াবেটিক হওয়ার পর ভাতের পরিবর্তে রুটি খাওয়া শুরু করে কিন্তু অনেকগুলা রুটি খায়! তাতে লাভটা কি হইল? পরিমানটা তো কমলো না। ভাত, রুটি দুইটাই তো কার্বোহাইড্রেড; কার্বোহাইড্রেড আমাদের শরীরের জন্য দরকার তবে পরিমাণটা কমিয়ে নিয়ে আসতে হবে। যারা সুস্থ আছেন তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য, পরিমানটা কমানোর চেষ্টা করতে হবে। তবে কার্বোহাইড্রেড কমানোর ক্ষেত্রে বিপ্লবী হওয়ার দরকার নাই। যারা দুই প্লেট ভাত খেয়ে থাকেন তারা দেড় প্লেটে নেমে আসুন, তারপর কয়েক সপ্তাপ পর এক প্লেটে নেমে আসুন, এক প্লেট থেকে থ্রী কোয়ার্টরে, বড় প্লেটের পরিবর্তে ছোট প্লেটে খাওয়ার অভ্যাস করুন, অর্থ্যাৎ আস্তে আস্তে কমিয়ে নিয়ে আসুন। চাল এবং আটার ক্ষেত্রে সাদার চাইতে ব্রাউন কালারের চাল / আটা অধিকতর স্বাস্থ্যসম্মত। ব্রাউনটাই অরিজিনাল কালার আর রিফাইন করার কারনে সেটা সাদা কালার হয়ে থাকে। তবে ব্রাউল কালারের কার্বোহাইড্রেড হোক আর সাদা কালারের হোক পরিমানটা কমিয়ে নিয়ে আসুন আজকে থেকেই।

 ১৯। অনেক মানুষ আছেন যারা বলেন আমি তো ‘চা’ তে এক চামচের বেশি চিনি খাই না, তারপর জিজ্ঞেস করে দেখেন প্রতিদিন কয় কাপ চা খায়, বলে ৭/৮ কাপ! সুতরাং কয় চামচ চিনি খান এটার সাথে প্রতিদিন কয় কাপ চা খান সেটা সম্পর্কিত। যে লোকটা দিনে এক কাপ চা খান তার জন্য চিনি একটু বেশি হলেও সমস্যা কম কিন্তু যে লোকটা প্রতিদিন কয়েক কাপ করে চা খেয়ে থাকেন তার জন্য চিনি বাদ দিয়ে দেয়া উচিত অথবা নাম মাত্র চিনি খেলেন।

২০। ফ্যাট (চর্বি) শুনলেই অনেকে আতকে উঠেন, অথচ ফ্যাট মাত্রই খারাপ না। কিছু ফ্যাট যেমন শরীরের জন্য ক্ষতিকর আবার কিছু ফ্যাট শরীরের জন্য বেশ উপকারি। Saturated fat হচ্ছে খারাপ ফ্যাট যেটা মুলত গরুর গোস্ত, ভেড়ার গোস্ত, চীজ, বাটার, ঘী, চকলেট, কেক, পেস্ট্রি, মিস্টি, আইসক্রীম, নারকেলের তেল, পাম ওয়েল এসবে বেশি পরিমানে থাকে। একজন পুরুষ মানুষ দৈনিক ৩০ গ্রাম এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে দৈনিক ২০ গ্রামের বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট খাওয়া বিপদজনক।Unsaturated fat হচ্ছে ভাল ফ্যাট যেটা মুলত মাছ, এভোকার্ডো, অলিভ / যাইতুন এবং নানা ধরনের বাদাম, সানফ্লাওয়ার, কর্ন এবং রেপসিড ওয়েলে পাওয়া যায়। বাংলাদেশে এভোকার্ডো এবং অলিভ পাওয়া না গেলেও মাছ এবং বাদাম এভেইলেবল আছে।

২১। দোকান থেকে যে কোন ফলের জুস কেনার ক্ষেত্রে লেভেলটা দেখে নিবেন কি পরিমান সেই ফলটা আছে নাকি সব ফ্লেভার, আর চেষ্টা করবেন যেসব জুসে no added sugar লেখা আছে সেগুলা কিনতে। অনেকে জুস কেনার ক্ষেত্রে দেখেন কোন কোম্পানির জুস কত মিস্টি! অর্থ্যাৎ জুসের পরিবর্তে এরা শরবত খুজতে থাকেন। শাক-সবজি রান্নার ক্ষেত্রে আগে ধুয়ে নিয়ে তারপর কেটে সবজিটা রান্না করবেন। অনেকে সবজি কেটে তারপর সেটা ধুয়ে রান্না করেন এটা ঠিক না।

২২। মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে নিজের সমস্যাটাকে কাছের মানুষদের সাথে শেয়ার করা, বুক ফাটে তো মুখ ফাটে না-এরকম হইলে সমস্যা। শেয়ার করার মাধ্যমে সমস্যাটা / কষ্টটা হালকা হয়ে উঠে এবং অনেক ক্ষেত্রে ভাল পরামর্শও পাওয়া যায়। পশ্চিমা দেশগুলাতে ব্যক্তি কেন্দ্রীক জীবন যাপনের কারনে মানুষ নিজের সমস্যাটা সেভাবে শেয়ার করতে চায় না ফলে যারা মানসিক রোগে ভোগেন সেটা আরো সিরিয়াস হয়ে উঠে; অন্যদিকে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলাতে পারিবারিক বন্ধন-জীবন যাপন শক্তিশালী হওয়ার কারনে অনেক মানসিক রোগ আপনা-আপনি ভাল হয়ে যায়। মনে করুন একটা ছেলে চাকুরী না পেয়ে হতাশায় ভুগতেছে তখন মা সেটা বুঝতে পারল এবং বলল ‘চাকুরী তো সব সরকারি দলের লোকদের আত্বীয়-স্বজনদের জন্য! তুই কিভাবে পাবি? আর তোর বাপের কি কম আছে নাকি? চাকুরী না পাইলে কি হবে? এই কথাটা একটা মাতৃত্বসুলভ কথা তবে এই ধরনের কথা এই ছেলেটার মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। যদিও এটা সমাধান না কিন্তু এই ধরনের কথা মানসিক স্বস্থি দিয়ে থাকে। সুতরাং নিজের দু:খ কষ্টকে লুকিয়ে না রেখে শেয়ার করুন। তবে পাবলিকলি শেয়ার করার দরকার নাই-টিভি চ্যানেলে গিয়ে, ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে। বৃটেনের একটা টিভি চ্যানেলে একটা অনুষ্ঠান চলছিল দীর্ঘদিন ধরে যেখানে মানুষ তার পারিবারিক সমস্যাগুলা খোলামেলা আলোচনা করত; পরে দেখা গেল এই অনুষ্ঠানটা মানুষের ক্ষতি করতেছে। কারন এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পাড়া প্রতিবেশি সবাই ঘটনাটা জেনে গেল, সবাই আলোচনা শুরু করল; এতে করে কেউ কেউ সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড করে বসল; শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠানটা বন্ধ করে দেয়া হলো। সুতরাং নিজের কষ্ট / সমস্যাটা চেপে না রেখে শেয়ার করুন তবে খুব কাছের কিছু মানুষের সাথে।

 ২৩। পাবলিক হেলথে মাস্টারস করার সময় আমার একটা মডিউল ছিল মেন্টাল হেলথ নিয়ে, তো মেন্টাল হেলথে ক্লাস নেয়ার সময় শিক্ষক বললেন তিনি কোন ধর্মে বিশ্বাস করেন না কিন্তু গবেষনা দ্বারা প্রমানিত ধর্ম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপকারি।

বিষয়টা বুঝার জন্য আমি কিছু উদাহরণ দিচ্ছি: মনে করুন পুলিশ একটা নিরপরাধ ছেলেকে ধরে নিয়ে গিয়ে জেলে ভরে মামলা দিয়ে দিল কিংবা এনকাউন্টার / ক্রসফায়ারের কথা বলে ছেলেটাকে হত্যা করল মাওবাদী কিংবা জঙ্গি অভিযোগ দিয়ে, কাজটা করে পুলিশটা হয়ত প্রমোশন পেয়ে গেল কিন্তু ছেলেটার মা-বাবার কথা চিন্তা করুন তারা কিভাবে বিষয়টাকে নিবে? যদি মা-বাবা ধর্মে বিশ্বাসী হয় তারা কান্নাকাটি করে আল্লাহর কাছে বিচার দিবে ‘আল্লাহ এই অন্যায়ের বিচারের দায়িত্ব আমি তোমাকে দিলাম’ এই বলে তাদের মনটা হালকা হয়। আর যদি মা-বাবা ধর্মে বিশ্বাস না করেন সেক্ষেত্রে তারা এই ধরনের অন্যায়ে কোন কুল কিনারা খুজে পান না, আর এই বিষয়টা যতবেশি মনের মধ্যে ঘুরপাক খাবে ততবেশি সেটা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। আবার মনে করুন কেউ বিয়ে করার অনেক বছর পার হয়ে গেল কোন বাচ্চা কাচ্চা হচ্ছে না তখন একজন ধর্মে বিশ্বাসী লোক নিজেকে হয়ত বলবে ‘এখন বাচ্চা না হওয়াটার মধ্যেই আল্লাহ তাদের জন্য কল্যান রেখেছেন, আল্লাহ চাইলে ভবিষ্যতে সন্তান দিবেন’ কিন্তু একজন ধর্মে অবিশ্বাসী লোক এসব ক্ষেত্রে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকেন যে তার বাচ্চা জন্ম দেয়ার কোন যোগ্যতা নাই আর এই দোষারোপটা যখন দিনের পর দিন চলতে থাকে তখন সেটা মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটায়।

এই কথাগুলার মানে এই নয় যে ধর্মে অবিশ্বাসী মাত্রই মানসিক রোগী! এই কথাগুলার অর্থ হচ্ছে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্মে বিশ্বাসী লোকজন ধর্মে অবিশ্বাসীদের তুলনায় সুবিধাজনক অবস্থানে থাকেন।

২৪। নিজের সাধ্যমত নিজের কাজটা করুন-দায়িত্বটা পালন করুন, তারপর ফলাফল যা হয় সেটা মেনে নিন, অহেতুক নিজের উপর স্ট্রেস তৈরি করবেন না, সন্তানদেরকে স্ট্রেস দিবেন না। ছেলে-মেয়েদেরকে পড়াশুনার জন্য মোটিভেট করুন কিন্তু অহেতুক প্রতিযোগিতার মধ্যে ফেলে তাদের মনের উপর স্ট্রেস দিবেন না। অমুকের বাচ্চা এই রেজাল্ট করেছে তোমাকেও এই রেজাল্ট করতে হবে নাহলে আমাকে মা ডাকতে পারবা না কিংবা বাবা ডাকতে পারবা না; এই ধরনের চাপ অনেক বাচ্চা নিতে পারে না, রেজাল্ট প্রকাশের পর স্ট্রেস নিতে না পেরে কেউ কেউ সুইসাইডও করে থাকে।

অন্যদের সাথে অহেতুক প্রতিযোগিতা করে নিজের উপরও স্ট্রেস নিবেন না। অমুকের আইফোন টেন আছে সুতরাং আমারো থাকতে হবে এইভাবে চিন্তা না করে বরং আপনার ক্ষেত্রে আইফোন টেনের প্রয়োজনীয়তা কতটুকু সেটা চিন্তা করুন।

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট নিয়া ডেল কার্নেগীর বাংলায় অনুবাদ হওয়া একটা বই পড়েছিলাম অনেক আগে, ডেল কার্নেগি বলতেছিল একসময় নানা ধরনের স্ট্রেস তাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল; তখন এক পর্যায়ে চিন্তা করতে লাগল: আচ্চা এই সমস্যাটা সমাধান না হলে কিংবা এই কাজটা না হলে কি তার ফাসি হয়ে যাবে? তার জেল হয়ে যাবে? না, ফাঁসি বা জেল কোন কিছুই হবে না; সুতরাং এত চিন্তার কি আছে! এভাবে করে স্ট্রেসটা মিনিমাইজ করে ফেললেন।

আপনি ডেল কার্নেগীর ফর্মুলা ফলো করবেন নাকি অন্যভাবে স্ট্রেস মিনিমাইজ করবেন সেটা আপনার ব্যাপার তবে স্ট্রেসমুক্ত থাকার চেষ্টা করুন। নিজের সাধ্য অনুযায়ী কাজ করুন তারপর ফলাফল যাইহোক মেনে নিন-আলহামদুলিল্লাহ আলা কুল্লি হাল।

 ২৫। আপনি যদি জিমে যান-হেভি এক্সারসাইজ করেন সেক্ষেত্রে সপ্তাহে দুই দিন করলেই হবে; আর যদি জিমে না গিয়ে নিজের মত করে মডারেট এক্সারসাইজ করেন সেক্ষেত্রে ৩০ মিনিট করে সপ্তাহে ৫ দিন করতে হবে। অনেকে সকালে হাটতে বের হন কিন্তু এত আস্তে হাঁটেন যে সেটা ব্যায়ামের পর্যায়ে যায় না, ব্যায়ামের উদ্দেশ্যে যখন বের হবেন সেটা যেন হাঁটা এবং দৌড়ানোর মাঝামাঝি হয় যেটাকে Brisk Walking বলে। ভাল থাকার জন্য শুধু ভাল খাবার যথেষ্ঠ না, আপনাকে ব্যায়ামের মাধ্যমে সেই খাবারকে বার্ন করতে হবে, একটিভ জীবন যাপন করতে হবে।

২৬। বাংলাদেশে যেভাবে মাছকে শুকিয়ে শুটকি বানানো হয় তেমনি দুনিয়ার নানা দেশে ফলকে শুকিয়ে শুকনা ফল বিক্রি করা হয়। তাজা ফল সাধারনত কয়েকদিনের বেশি টিকে না তবে শুকনা ফল ৬/৭ মাস পর্যন্ত ভাল থাকে। ফরমালিনের ভয়ে যারা ফল খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন তারা শুকনা ফল খাইতে পারেন। ক্যারিবিয়ান দেশগুলাতে কলা এবং আনারসকে ড্রাই করে চিপস বানিয়ে বিক্রি করা হয়, বাংলাদেশের নিকটবর্তী ফিলিপাইনে নানা ধরনের ফলকে শুকিয়ে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশে শুকনা আঙ্গুর পাওয়া যায় যেটাকে আমরা কিসমিস বলে থাকি, এছাড়া প্লামকে শুকিয়ে বিক্রি করা হয় যেটাকে আলু বুখারা বলে; তবে আরো নানা জাতের ফলকে শুকিয়ে বিক্রি করার উদ্যোগ নিলে কৃষকের যেমন ফল বিক্রির তাড়া থাকবে না তেমনি ফরমালিনের ভয়ে ভীত মানুষজনও ফল খাওয়ার অভ্যাসটা কন্টিনিউ করতে পারবে এবং এই রিলেটেড নতুন ব্যবসা খাত তৈরি হবে।

২৭। বাংলাদেশে যেহেতু ফিলিস্তিন বা মেডিটোরিয়ান এলাকার যাইতুন বা অলিভ নাই সেজন্য বিকল্প হিসাবে জলপাই খাইতে পারেন। মিস্টি আলুর সিজনে বেশি করে মিস্টি আলু খাবেন-মিস্টি আলু অত্যন্ত পুস্টিকর খাবার। আর একটা খাবার যেটা না খাইলেই নয় সেটা হচ্ছে কুমড়ার বিচি। কুমড়ার বিচি হার্টের জন্য উপকারি, আনস্যচুরেটেড ফ্যাট / ভাল ফ্যাট আছে এবং একই সাথে পুরুষের স্পার্ম উৎপাদনে কাজে লাগে।

 ২৮। একজন মানুষের দৈনিক ৬-৮ গ্লাস পানি খাওয়া দরকার অর্থ্যাৎ দেড় থেকে দুই লিটার পানি তবে মহিলাদের ক্ষেত্রে মাতৃকালীন সময়ে পানি খাওয়ার পরিমানটা আরো বাড়ানো উচিত।

দুধ এবং দুধ জাতীয় খাবার আপনার শরীরের ক্যালসিয়ামের চাহিদা পুরন করবে। একজন মানুষের দৈনিক এক গ্লাস দুধ খাওয়াই যথেষ্ঠ।

 ২৯। যারা রবিবারে চার্চে যায় আর যারা যায় না এভাবে দুটি গ্রুপে ভাগ করে তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকটা তুলনা করে দেখা গেছে যে চার্চে যাতায়াতকারি গ্রুপটার মানসিক স্বাস্হ্য অন্য গ্রুপটার থেকে ভাল আছে। এর কারন হিসাবে বলা হয়ে থাকে চার্চে যেই আন্তরিক পরিবেশে কুশল বিনিময় হয় এবং একজনের কোন বিশেষ সমস্যা নিয়ে অন্যরা যেভাবে সমব্যাথী হয় সেটা একজন মানুষের মানসিক সুস্বাস্থ্যের জন্য উপকারি। একই কথা অন্য ধর্মীয় উপসনালয়ের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হওয়ার কথা।

সুতরাং চার্চে হোক কিংবা মসজিদে হোক কিংবা প্রতিবেশির সাথে হোক কুশল বিনিময় করবেন, অন্যের দু:খ কষ্টে এগিয়ে যাবেন, জগতটাকে বউ বাচ্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখবেন না। আপনি যখন অন্যের প্রতি আন্তরিকতা দেখাবেন, অন্যরাও আপনার প্রতি আন্তরিকতা দেখাবে। মনে রাখবেন শারিরীক স্বাস্হ্য এবং মানসিক স্বাস্হ্য একটা আরেকটার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

 ৩০। কাজ করুন, হাটা চলা করুন, একটিভ থাকুন; শুয়ে বসে থাকলে আপনাকে রোগ পেয়ে বসবে, কাছাকাছি দুরত্বে রিকশায় না উঠে হাটুন, সপ্তাহে একদিন বাসা বাড়ী পরিস্কার করুন-পরিস্কারও হইলো-শরীরের মুভমেন্টও হইল। প্রেগনেন্ট অবস্থায়ও একটিভ থাকা জরুরি-শরীর যতটুকু কুলায়-তাহলে নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা বাড়বে। রাতের খাবারটা তাড়াতাড়ি খেয়ে ফেলুন, খাবার খেয়েই বিছানায় যাবেন না, ২/৩ ঘন্টা সময় নিন। বেশি বেশি ফল এবং সবজি খাওয়ার অভ্যাস করুন। ফল খাওয়ার ক্ষেত্রে দেশী ফল খান এবং যেই সিজনে যেই ফলটা বেশি পাওয়া যায় সেটাই বেশি করে খাওয়ার চেষ্টা করুন।প্রতিবেশি-আত্বীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক রাখুন-কুশল বিনিময় করুন, অন্যের দু:খ কষ্টে এগিয়ে যান; সবাইকে নিয়েই ভাল থাকার চেষ্টা করুন।

* লেখকঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী, লন্ডন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি থেকে পাবলিক হেলথ এ স্নাতকোত্তর ও প্রাক্তন হেলথ টিউটর সোশ্যাল একশন ফর হেলথ, লন্ডন।