শেওলা থেকে জ্বালানি তেল: বাংলাদেশি তরুণ বিজ্ঞানীর সাফল্য

মুতাসিম বিল্লাহ নাসির
বাংলাদেশের তরুণ বিজ্ঞানী, ড. মোঃ আশরাফুল আলম। কুমিল্লার মেঘনা উপজেলায় জন্ম ও বেড়ে উঠা, নিজ গ্রাম জয়পুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা জীবনের শুরু। সেখানেরই শিক্ষক ছিলেন বাবা আব্দুস সোবহান। তার তত্ত্বাবধায়নেই প্রাথমিক শিক্ষাজীবনের হাতেখড়ি। এরপর মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়েছেন চন্দনপুর এম এ উচ্চ বিদ্যালয়, উচ্চমাধ্যমিকে আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজের বিজ্ঞান বিভাগে। এরপরে ¯œাতক ও ¯œাতকোত্তর করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অলটারনেটিভ (ইউডা) থেকে বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে। তার গবেষণার হাতেখড়িও এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর ও বাংলাদেশের অন্যতম বিজ্ঞানী ড. রহমতউল্লাহ্ এর হাতে।

চাইনীজ অ্যাকাডেমি অফ সায়েন্স- কুনাগংযু ইন্সিটিউট অব এনার্জি কনভারশন চীন সরকারের একটি বিশেষায়িত ইন্সিটিউট যেখানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি (সৌর জ্বালানি, জৈব জ্বালানি, বায়োগ্যাস, বায়ু ও পানি শক্তি ইত্যাদি) নিয়ে গবেষণা করা হয়। প্রতিষ্ঠানটি বায়োমাস এনার্জি এন্ড আর ডি বিভাগ জ্বালানি উৎপাদনের জন্য বেছে নেন খানিকটা ভিন্ন আর কম প্রচলিত একমাধ্যম। সেটি হলো শৈবাল বা শেওলা। শৈবাল থেকে জৈব জ্বালানি উৎপাদনে সব ধরনের সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য চায়না ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন এর অনুদানে চলছে এক দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প। এখানে গবেষক হিসেবে কাজ করেন আশরাফুল আলম। তার আগে তিনি ২০১৫ সালে দালিয়ান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে একই বিষয়ের উপর পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন। সম্প্রতি তিনি চায়না ন্যাশনাল ন্যাচারাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন ইন্টারন্যাশনাল ইয়ং সাইন্টিস্ট এওয়ার্ড পেয়েছেন।

গবেষণা প্রকল্পের পাশাপাশি তিনি জার্নাল অফ কেমেস্ট্রিতে জৈব জ্বালানি বিষয়ক বিশেষ সংখ্যা এবং স্প্রিঞ্জার নেচার এর বইয়ের সম্পাদক বা এডিটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

শৈবাল থেকে জৈবজ্বালানি-আগ্রহের বিষয়ে তিনি জানান বর্তমানে প্রচলিত জৈব জ্বালানি যেমন সয়াবিন, কর্ন ও ক্যানোলা অয়েল আর প্রাণিজ চর্বি- এগুলো থেকে জ¦ালানি উৎপাদন করতে হলে সব গুলোরই চাষ দরকার। তাছাড়া এর সীমাবদ্ধতাও আছে নানান রকম। তাতে যেমন অনেক জমির দরকার তেমনি পরিশ্রমও করতে হয় অনেক।

এর আরেকটি সমস্যা হলো যদি এগুলো চাষের জন্য বেশি জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়, তবে খাবারের জন্য জমিতে খাদ্য সংকট দেখা দেবে। তাই আমি ও আমার সহকর্মীরা বিশ্বাস করি, জ্বালানি খাতে বিদ্যমান সমস্যার সমাধানে বিকল্প হতে পারে এই শৈবাল।

আশরাফুল মনে করেন, শৈবাল খুবই সহজ লভ্য, আর কম জমিতে অল্প প্রয়াসে শৈবালের বাণিজ্যিক উৎপাদন করা যায়। এমনকি ময়লা প্রক্রিয়াজাত করণের পুকুর বা ওয়েস্টস্ট্যাবিলাইজেশন পুকুরে শৈবালের চাষ করা যায়। শুধুতা-ই নয়, শৈবাল থেকে তেল বের করার পরে যতটুকু অবশিষ্ট থাকে, সেটিও পুষ্টিকর, যা মাছ ও অন্যান্য প্রাণীর পুষ্টি চাহিদা পূরণে ব্যবহৃত হতে পারে। তার ওপর শৈবাল যেহেতু নিজের খাদ্য চক্রে কার্বনডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সুতরাং বাতাসে গ্রিন হাউসগ্যাসের পরিমাণ কমাতেও দারুণ কার্যকর এটি।
কী উপায়ে শৈবাল থেকে তেল বের করা হয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, শৈবাল থেকে তেল বের করার পদ্ধতি অন্য সব জৈব জ্বালানি উৎপাদনের মতোই। মূলত চারটি ধাপে তেল আহরণের কাজটি করা হয়। সবার আগে কাঙ্ক্ষিত পরিবেশে শৈবালের চাষ ও বৃদ্ধির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে শৈবালগুলোকে পানি শূন্য করা হয়। পরের প্রক্রিয়ার নাম হলো শুকানো। সবশেষে রয়েছে শুকনো শৈবাল থেকে তেল আহরণ। শৈবালকে পানি মুক্ত করতে অনেক শক্তির প্রয়োজন পড়ে।

গবেষণায় তিনি কি নতুন মাত্রা যোগ করলেন জানতে চাইলে ড. আলম বলেন, আমার গবেষণার মূল টার্গেট ছিল এমন একটা উপায় খুঁজে বের করা যাতে করে পানি থেকে ক্ষুদ্রাকার শৈবালগুলোকে কম শক্তি ও খরচে সংগ্রহ করা এবং যতটা সম্ভব শৈবালকে পানিমুক্ত করা যায়। গবেষণা এবং অর্থনৈতিক নিরিক্ষা দ্বারা প্রমাণিত শৈবাল থেকে জৈবজ্বালানি উৎপাদনের মোট খরচের প্রায় ৩০% এই ধাপটির জন্য হয়ে থাকে। আমরা বায়োফ্লোককুলেশন নামে একটি নতুন ধারণা নিয়ে আসার চেষ্টা করি যা অর্থনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে এই শিল্পের জন্য অনেক ভাল আবিষ্কার বলে সমাদৃত হচ্ছে। এই প্রকল্পের কাজের সময় আমি মাইক্রো শেওলার ফ্লোককুলেশন মেকানিজম নিয়ে গবেষণা করি এবং ফ্লোককুেলশন এর জন্য দায়ি হলো ‘পলিসেকারাইড মৌল’ এটি প্রমাণ করতে সমর্থ হই।’

তিনি জানান তার গবেষণার ফলাফলের উপর ভিত্তি করে এখন এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত জিন সনাক্তকরণের কাজ চলছে। তাছাড়াও তারা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং প্রক্রিয়ায় ২ টি নতুন শৈবাল পেয়েছেন যাদের ফ্লোককুলেশন এর হার সাধারণ শৈবাল থেকে অনেক বেশি। সাধারণত ট্রান্স এস্টারিফিকেশন প্রক্রিয়ায় শুকনো শৈবাল থেকে বায়ো-ডিজেল উৎপাদন করা হয়, শৈবাল শুকনো করার জন্য ও একরকম খরচ আছে। তার সাম্প্রতিক গবেষণা চলছে শৈবাল শুকনো প্রক্রিয়ার বদলে ভেজা শৈবাল থেকে বায়ো-ডিজেল উৎপাদনের বিষয়ে। গবেষণা সফল হলে শুকানোর সময় ও এনার্জি খরচ থেকে রেহাই মিলবে। ড. আশরাফুল বলেন, আমরা এখন এই গবেষণার পাইলট স্টেজ এ কাজ করছি পুর প্রক্রিয়াকে অপটিমাইজ করার জন্য, আমরা খুবই আশাবাদী আমাদের সফলতা সবুজ শৈবাল থেকে তরল জ্বালানি উৎপাদন খরচ অনেক কমিয়ে দেবে এবং পরিবেশ রক্ষায় বড় অবদান রাখবে।

ড. আলমের প্রায় ২৫ টিরও বেশি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন বিজ্ঞান জার্নাল এ প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশের একটি বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় থেকে কিভাবে এতোদূর যাওয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, আজকের অবস্থানে আসার অবদানের তালিকা অনেক বড়। অনুপ্রেরণার শুরু পরিবার থেকেই। প্রাতিষ্ঠানিক তথা বায়োলজি নিয়ে গবেষণায় আসার স্বপ্ন দেখাতেন হাইস্কুল এর জীববিজ্ঞানের শিক্ষক হান্নান স্যার। তার পরামর্শ ছিলো ‘মুরগীর গোশত খাওয়ার সময় হাড়ের গঠনটি যেন গভীর মনোযোগে দেখে নিই’ তার এই বাক্যটা বিজ্ঞানের অন্যতম শর্ত পর্যবেক্ষনের করার স্পৃহা আমাকে শিখিয়েছে, ইউডাতে পড়াকালীন সময়ে প্রফেসর রহমতউল্লাহ্, রওনক জাহান, আতাহুজামান, সফিউল আযামসহ অনেকের কাছ থেকে গবেষনার হাতেখড়ি। নিজের লক্ষ্যে পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত কিভাবে একাগ্রতা নিয়ে দীর্ঘ সময় গবেষণার মননিবেশ করে থাকতে হয় সে বিষয়ে শিখিয়েছেন গবেষণার সর্বোচ্চ ডিগ্রি পিএইচির দিকনির্দেশক ও পরামর্শক প্রফেসর বাই ফেংও ও যাও সিনসিং। বর্তমান বস প্রফেসর জংমিং ওয়াং দিচ্ছেন গবেষণার অবাধ স্বাধীনতা যা পিএইচডি পরবর্তী সময়ে আত্মনির্ভরশীল গবেষক হিসেবে ঘরে উঠতে সাহায্য করছে।

বাংলাদেশে জ্বালানি সংকট সমাধানে ভীষণ কার্যকর একটি মাধ্যম হতে পারে এই শৈবাল। তবে এ জন্য এ বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা আর উপযুক্ত গবেষণা প্রয়োজন, দরকার সরকারি পৃষ্টপোষকতার। ড. আশরাফুল আলম মনে করেন, প্রতি বছর বাংলাদেশ সরকার হাজার হাজার কোটি টাকার পেট্রোলিয়াম প্রোডাক্ট আমদানি করে। সেক্ষত্রে দেশের অভ্যন্তরে বিকল্প জ্বালানি উৎপাদন করতে পারলে হাজার হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ দূষণও রোধ করা যাবে।