রবীন্দ্র-লালনের পথে একদিন

লাবু হক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়;
দিনটি ছিল শনিবার। ক্যাম্পাস জীবনের প্রথম শিক্ষাসফর। খুব সকালে অনেক আবেগ উৎকন্ঠা নিয়ে ঘুম থেকে উঠলাম। ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি। কিছুটা শীত শীত ভাব। গোসল করব? না করব না এমন একটা অবস্থা। তাও পরে গোসল করে নিলাম। এক বড় ভাইয়ের ফোন আসল, ‘লাবু রেডি হয়েছ তো? হ্যা, ভাই আমি রেডি। ও আচ্ছা, ভাল। তোমার সহপাঠিদেরকে ও ফোন দিয়ে রেডি হতে বলো, ঠিক আছে ভাই।’ আমি আমাদের শ্রেণি প্রতিনিধি ছিলাম, তাই সবাইকে জানিয়ে দিলাম।

ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হলাম। তখনো আবছা আবছা অন্ধকার আছে চারদিকে। একা আসতেছি বলে দুই একটা কুকুর আড় চোখ তাঁকায় আমার দিকে। কুকুরকে অনেক ভয় পাই তাও সেদিন কোনো ভয়লাগা কাজ করছিল না। এদিকে শুরু হল শীতের সকালে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। কাপড়-চুপর হালকা ভিজেই গেল। নানা প্রতিকুলতা পেরিয়ে তাও ক্যাম্পাসে গিয়ে পৌছালাম।
গিয়ে দেখি, আমার আগেই আরও কয়েকজন আসছে, গাড়িও চলে আসছে। ততক্ষনে সকাল হয়ে গেছে, একে একে সবাই জড়ো হলাম বড় ভাই আপুরা আসলো, একটু পরে স্যারও আসলো। আমরা একে একে চাল, ডাল, ডেগজি-পাতিল, জ্বালানি কাঠ সহ সকল মালপত্র গাড়িতে তুললাম। পরে সবাই যার যার জায়গা মত বসলাম।

গাড়ি ছাড়ল, উহ! অনেকদিন পর যেন কোন এক বদ্ধনগর থেকে ক্ষণিকের জন্য মুক্তি পেলাম। সবাই গান শুরু করল, কেউ গাইতেছে আবার কেউ নাচতেছে। আর আমি জানালা দিয়ে সবুজ মাঠ দেখি। শহরে অনেক দিন ধরে থাকায় সবুজ মাঠ দেখা হয় নি বেশ কিছুদিন। আমি গ্রামে বড় হয়েছি, সবুজ মাঠ দেখতেই অভ্যস্ত। গাড়ি থেকে রাস্তার ধারে দেখি অনেক কৃষক জমিতে রোপা গাড়তেছেন। এসব দেখে অনেক ভালো লাগছিলো।
আমাদের সকালের নাস্তা দেওয়া হল। সকলে মিলে নাস্তা করলাম। খাওয়া শেষে আবারো সকলে মিলে গান শুরু করলাম।
আগেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল আমরা তিন জায়গায় ভ্রমন করব। প্রথমত রবীন্দ্রনাথের কুঠিবাড়ী, তারপর লালন শাহ্ মাজার, সবশেষে হার্ডিঞ্জ সেতু ।

পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পাকশীতে যখন আমরা তখন এক বড় ভাই আমাদের বলল ঐ যে দেখ হার্ডিঞ্জ সেতু, সকলেই নাচ-গান বাদ দিয়ে সবাই দাড়িয়ে জানালা পাশে উকি দিয়ে গাড়ি থেকেই দেখতে লাগলাম হার্ডিঞ্জ সেতু, দেখলাম সত্তিই এর বিশালতা অনেক। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে দীর্ঘ রেলসেতু হিসেবে পরিচিত। পাবনা জেলার পাকশি রেলস্টেশনের দক্ষিণে পদ্মা নদীর উপর এই সেতুটি অবস্থিত।
সেতু এক সময় শেষ হয়ে গেল, আবারও সবাই যার যার আসনে বসে পড়ল। তখন দুপুর বারোটা আরেক বড় ভাই সবাইকে জানিয়ে দিল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা কুঠিবাড়িতে পৌছাব। শুনে সবাই তখন আরো বেশি আনন্দিত, আরো বেশি তখন নাচা-গাওয়া শুরু করল সবাই।

দুপুর এক টা। গাড়ি রবীন্দ্র কুঠিবাড়ীতে পৌছালো। দীর্ঘ ভ্রমনের পর সকলে নিজেদের গন্তব্যস্থলে পৌছালাম। সবাই আমাদের জিনিসপত্র নিয়ে একে একে গাড়ি থেকে নামালাম। তারপর ব্যস্ত হয়ে গেলাম তাবু স্থাপনের কাজে। তাবু স্থাপন করলাম কুঠিবাড়ি থেকে একটু সামনে। এরপরে সবাই মিলে গেলাম রবীন্দ্রনাথের অমর কীর্তি সেই কুঠিবাড়ি দর্শন করতে।
প্রথমে টিকেট কাটা হল, পনের টাকা করে টিকেট। আমাদের শিক্ষক একসাথে সকলের টিকেট কেটে নিল। ৫৪ জনের মতো হয়তো ছিলাম, ঠিক মনে করতে পারছি না। গেটম্যান আমাদের গুনে গুনে ভিতরে প্রবেশ করতে দিল।
শিলাইদহে রবিঠাকুরের বাড়িটা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গেছিলাম। বাড়িটা দেখতে অনেকটা বাংলো টাইপের। তবে সেটা তিন তলা পর্যন্ত লম্বা। ইট-কাঠ আর টিন দিয়ে বানানো বাংলোটা কিন্তু অবিকল আগের মতোই আছে।

কুঠিবাড়িটি বর্তমানে জাদুঘর হিসেবে বিবেচিত। তাই আমিও সেটাকে জাদুঘরই বলব। ভিতরে প্রবেশ করে গুনে দেখলাম পুরো জাদুঘরটিতে প্রায় আঠারটি কক্ষ, সতেরটি দরজা ও ত্রিশটি জানালা আছে। জাদুঘরটির নিচতলা আর দ্বিতীয়তলা মিলে দেখলাম ষোলটি কক্ষ রয়েছে। প্রতিটি কক্ষ ঘুরে ঘুরে দেখলাম, রবি ঠাকুরের নানা বয়সের বিচিত্র ভঙ্গির ছবি দিয়ে ছবি সজ্জিত ছিল প্রতিটি কক্ষ । একেবারে বাল্যকাল থেকে শুরু করে মৃত্যুসজ্জার ছবি পর্যন্ত সংরক্ষিত আছে। সেখানে রবিঠাকুরের ব্যবহৃত নানা জিনিসপত্র। তিনি কোথায় বসে লিখতেন, কোন পালঙ্কে ঘুমাতেন। এমনকি কোন থালায় খাবার খেতেন, তাও দেখলাম সেখানে। ব্যবহার্য জিনিসগুলোর ভিতর দেখলাম সেখানে আছে চঞ্চলা ও চপলা নামের দুটো স্পিডবোট,পল্টুন, আট বেহারার পালকি, কাঠের চেয়ার, টি টেবিল, সোফাসেট, আরাম চেয়ার, পালংকসহ আরো অনেক কিছু, যেগুলোর নাম আমি মনে করতে পারতেছি না।

জাদুঘরটির তৃতীয় তলায় গিয়ে দেখলাম একটি কামড়া, শুনলাম সেই কামড়াটিতে নাকি রবি ঠাকুর বসে বসে লিখা লিখির কাজ করতেন।
বাড়ির বাইরে বেরিয়ে দেখলাম, প্রায় ১১ একর জায়গার উপরে আম-কাঁঠাল আর নানা জাতের ফলের গাছের বাগান। দেখলাম বিশাল বড় এক ফুলের বাগান। আরও দেখলাম বেশ বড়সড় ২টি পুকুর। পুকুর পাড়ে গিয়ে সবাই মিলে আমরা বসলাম, স্যার-ম্যাম ও আমাদের সঙ্গ দিল। সবাই মিলে বসে বসে সেখানে কুলফি খেলাম। কুষ্টিয়ার কুলফি বিখ্যাত সেটা জানতাম আগে থেকে।
কুলফি খাওয়া শেষে সবাই মিলে ফিরে আসলাম তাবুতে। যখন সবাই আনন্দে মাতোয়ারা তখন ঘটল আরেক ঘটনা! আমাদের এক বান্ধবির মোবাইল ফোন হারিয়ে গেল। শুনে সবাই কিছুটা বিষন্নতা পেয়ে বসল। তবে আমাদের জন্য কিছু খেলাধুলা নির্ধারিত করা ছিল। ছেলেদের বেলুন ফোটানো আর মেয়েদের বল বদল। মেয়েদের খেলাতে রেফারি থাকার জন্য আমার চোখ বেঁধে দেওয়া হলো। খেলা পরিচালনা করলাম। ছেলেদের খেলাতেও আমাকেই রেফারি রাখা হলো। যেখানে আমি খেলোয়ার হিসেবে থাকার কথা সেখানে হলাম রেফারি। যাহোক তাও ভালোই লাগছিল। খেলাধুলা শেষে বিজয়ীদের পুরস্কার প্রদান করা হলো। সবাই দুপুরের খাওয়া দাওয়া করলাম। খাওয়া শেষে আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে গেলাম ঘোড়ার পিঠে উঠতে। ঘোড়ার পিঠে আমরা না উঠে, উঠালাম আমাদের এক বান্ধবিকে। ভাবছিলাম সে ভয় করবে, ভয়ে কেঁদে দিবে, কিন্তু আমাদের আশা পূর্ণ হল না। সে অনেক সাহসিকতার পরিচয় দিল।
তারপর আবার আমরা ফিরে আসলাম তাবুতে। ততক্ষণে তাবু গাড়িতে তুলে ফেলা হয়েছে। সবাই গাড়িতে উঠে পড়েছে। আমরাও গাড়িতে উঠলাম। স্যার বলল সময় বেশি নাই আমরা লালন শাহ্ মাজারেও যাব। ফেরার পথে আমরা লালন শাহ্’র মাজার পরিদর্শন করলাম। পরিদর্শন শেষে বাসার দিকে রওনা দিলাম। আর কিছু স্মৃতি সেখানে রেখে আসলাম, যা কখনোই ভোলার নয়।

10 Shares