মে দিবস-প্রাপ্তি ও বাস্তবতা

মুনির আহমদ
পহেলা মে, মেহনতি ও শ্রমজীবি মানুষের অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার প্রতিকী দিন। বিশ্বময় পালিত হয় মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে। শ্রমিকদের ঐক্য, সংহতি ও অস্তিত্ব ঘোষণার দিন হিসেবে। দিনটি শ্রমিকদের বিজয় ও আনন্দ প্রকাশের দিন। অবিচার, শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে জোর সংগ্রামের শপথ গ্রহণের দিন। এই দিনটি সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতি ও গোষ্ঠীর নিপীড়িত শ্রমজীবি মানুষকে একই সমতলে দাঁড় করিয়ে দেয়। স্মরণ করিয়ে দেয় শ্রমিকদের আত্মত্যাগের কথা। তাদের ন্যায্য দাবী যে উপেক্ষার নয় সেই উপলব্দির কথা। এই দিনে শ্রমিকরা নিজেদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে উন্নয়নমুখী পরিবর্তন সূচনার অঙ্গীকারের প্রয়াসে। দিবসটির তাৎপর্য তুলে ধরে মহামতি লেনিন ১৯০৪ সালে, এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘শ্রমিক বন্ধুগণ! মে দিবস আসছে, সকল দেশের শ্রমজীবি মানুষ ইহা পালন করবেন, তাদের জেগে ওঠার ও আত্মসচেতন জীবন গড়ার প্রত্যয়ে, তারা একাত্মতা ঘোষণা করবেন সেই সংগ্রামের প্রতি যা অনাহার, দারিদ্রতা, অপমান, নির্যাতন, নিপীড়ন সহ সকল প্রকার জবরদস্তির অবসান ঘটাবে। সমাপ্ত হবে মানুষ কর্তৃক মানুষ শোষণের সকল প্রকার ব্যবস্থার। দুইটি বিশ্ব পরস্পর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে; মহান লড়াইয়ের জন্য। পুঁজিবাদ বিশ্ব ও শ্রমিক শ্রেণীর বিশ্ব, শোষক শ্রেণীর ও দাসত্বের বিশ্ব এবং ভ্রাতৃত্বের ও স্বাধীনতার বিশ্ব’’।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শ্রমিক ও শ্রমজীবি মানুষ একাট্টা হয়ে নানা সমাবেশ, মিছিল, শ্রমিক জনসভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদির মধ্যদিয়ে দিবসটি পালন করে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালিত হয় অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে। দিবসের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শুভেচ্ছা বার্তা জ্ঞাপন করেন। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন শ্রমিক সমাবেশের মাধ্যমে হে মার্কেটে সংঘটিত ঘটনা স্মরণ করে নিজেদের সেই রক্তাক্ত সংগ্রামে অর্জিত বিজয়ে উল্লসিত হয়ে ওঠে। বিশ্বের ৮০টি দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও দিবসটি সরকারি ছুটির দিন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুই প্রথম মে দিবসকে ছুটির দিন হিসেবে ঘোষণা করেন। এবারের মে দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়; ‘‘শ্রমিক মালিক ঐক্য গড়ি
উন্নয়নের শপথ গড়ি’’।

বিশ্বব্যাপী শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ দিনটি প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে শ্রমিক শ্রেণীর আত্মদান ও বীরোচিত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে ঝরেছিল শ্রমিকের রক্ত। সেই রক্তের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার। মুক্তি মিলেছে তাদের দীর্ঘ শোষণ আর বঞ্চনার। অবসান হয়েছে শৃঙ্খলিত জীবনের। মুক্তি মিলেছে পুঁজিবাদী দাসত্ব থেকে। উম্মোচিত হয় শ্রমজীবি শ্রেণীর জীবনের নতুন দিগন্ত। তৈরী হয় স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগের ক্ষেত্র। তারা পেতে শুরু করে শ্রমের উপযুক্ত মর্যাদা। তাদের চিন্তা চেতনায় আসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। সাহস অর্জন করে সকল বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করে অধিকার আদায়ে এগিয়ে যাওয়ার। দৃঢ় ও মজবুত হয় তাদের ঐক্য ও সংহতি। সমাজ থেকে দূর হতে থাকে শোষণ, বঞ্চনা ও গ্লানি। অবসান হতে থাকে শ্রেণী বৈষম্যের। মালিক পক্ষের সাথে শ্রমিক শ্রেণীর যে উঁচু-নিচু সম্পর্ক ছিল তাও একসময় নেমে আসে সমতলে। ইতিহাসে সূচীত হয় সামাজিক পরিবর্তনের আরেকটি নতুন প্রেক্ষাপট।
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। সেটা ছিল পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিকদের কাজের কোন শ্রম ঘন্টা নির্ধারিত ছিলনা। তাদের দৈনিক ১৬ থেকে ১৮ ঘন্টা কাজ করতে হত। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা শ্রম দেয়ার পরও তারা উপযুক্ত মজুরি পেত না। এমনকি শ্রমিকদের সুবিধা, অসুবিধা, মানবিক অধিকার ও দু:খ-কষ্ট কোনটাই মালিকরা বিবেচনায় নিতনা। নিজেদের ভৃত্য মনে করে তারা সামন্তবাদী চেহারায় শ্রমিকদের প্রতি অমানবিক আচরণ করতো। চালাতো নির্যাতন ও নিপীড়নের স্টীম রোলার। সপ্তাহজুড়ে হাড়ভাঙ্গা শ্রম দেয়ার পর শ্রমিকদের স্বাস্থ্য কেবল ভেঙ্গেই যেতনা উপরন্ত বিশ্রামের অভাবে, অনাহারে ও অনিদ্রায় শরীর ক্রমান্বয়ে কঙ্কালসার হয়ে পড়তো। শ্রম দাসত্বের নিগড়ে শ্রমিকদের এই মানবেতর জীবনযাপন অসহনীয় হয়ে ওঠে। মালিক পক্ষের সীমাহীন শোষণ, বঞ্চনা, নিপীড়ন ও অনাচারের বিরুদ্ধে এক সময় তারা প্রতিবাদ গড়ে তোলে। প্রতিবাদের সুর ধীরে ধীরে সুসংগঠিত হয়ে বিস্ফোরণের আকার ধারণ করে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে। শ্রমিকরা দৈনিক ৮ ঘন্টা শ্রম নির্ধারণের, উচ্চতর মজুরি এবং উন্নত কর্মপরিবেশের দাবী জানিয়ে ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটে সর্বাত্মক ধর্মঘট আহ্বান করে। শ্রমিকদের দাবীগুলি ছিল ন্যায়সঙ্গত। কিন্তু মালিক শ্রেণী তা মানেনি। ফলে সমগ্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লক্ষ শ্রমিক কলকারখানার কাজ ফেলে ঐ দিন রাস্তায় নেমে আসে। অত্যন্ত নৃশংসকায়দায় সে দিন ধর্মঘটি শ্রমিকদের সরিয়ে দেয়া হয়। ৩ মে তারা পুনরায় সমবেত হলে শিকাগো পুলিশের গুলিতে ৬ জন শ্রমিক নিহত হন। হত্যার প্রতিবাদে ৪ মে হে মার্কেট স্কয়ারে স্মরণাতীতকালের বৃহত্তম শ্রমিক সমাবেশ হয়। সমাবেশে মিল মালিকদের বোমা বিস্ফোরণ ও পুলিশের বর্বরোচিত হামলায় প্রাণ হারায় আরো ৪ শ্রমিক। রক্তে রঞ্জিত হয় হে মার্কেট চত্বর। শ্রমিকের রক্তাক্ত কাপড় হয়ে ওঠে তাদের লাল পতাকার স্মারক স্মৃতি হিসাবে। ধর্মঘট আহ্বান এবং আন্দোলনে অংশ নেয়ার অপরাধে পরবর্তীতে প্রহসনমূলক বিচারের মাধ্যমে শ্রমিক নেতা অগাষ্ট স্পাইসসহ আরো পাঁচজনের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। একজন শ্রমিক নেতা কারাভ্যন্তরে আত্মহত্যা করেন। অন্য একজনের ১৫ বছর কারাদ- হয়।

রাষ্ট্রযন্ত্র ও মালিকদের দমন পীড়নে শ্রমিকরা সেদিন দমে যায়নি। সরে আসেনি তাদের ন্যায্য দাবী থেকে। বরং রক্তদানের মাধ্যমে দাবী আদায়ে তাদের সংকল্প আরো সুদৃঢ় হয়। উজ্জীবিত হয় বিল্পবী চেতনা। তেজোদীপ্ত হয়ে ওঠে তাদের প্রেরণা। মনোভাব হয় আপোষহীন। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন¦ দেশে। বিশ্বময় গড়ে ওঠে শ্রমিক-জনতার বৃহত্তর ঐক্য। ১৮৮৯ সালের ১৪ জুলাই প্যারিস-এ অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে পহেলা মে-কে শ্রম দিবস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ঠিক তার পরের বছর পহেলা মে আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার বিরাট এক বিক্ষোভ মিছিলের মাধ্যমে এর স্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। এভাবেই আন্তর্জাতিকভাবে মে দিবস পালনের সূচনা হয়। জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারই এক অঙ্গ প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক শ্রম সংগঠনের জন্ম হয়। এই সংগঠন শ্রমিক ও মালিক উভয়ের জন্যে বেশ কিছু নীতি নির্ধারণ করে দেয়। এভাবেই বিশ্বময় শ্রমিকদের অধিকারের স্বীকৃতি আসে। পহেলা মে প্রতিষ্ঠিত হয় আন্তর্জাতিক শ্রম দিবস হিসেবে। স্বীকৃতি পায় লাঞ্চিত, বঞ্চিত কুলি, মজুরদের উত্থানের একটি পরম পর্ব হিসেবে। দিবসটি দেশে দেশে লাভ করে যথাযোগ্য মর্যাদা। পরিচিতি পায় শ্রমজীবি মানুষের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক হিসেবে।

মে দিবস শ্রমজীবি মানুষদের নিরবিচ্ছিন্ন সংগ্রামের এক রক্তাক্ত ফসল। কিন্তু এই ফসল আবাদ কী শ্রমিকরা ভোগ করতে পারছে? শোষণ, বঞ্চনা, অবজ্ঞা, উপেক্ষা, মজুরী বৈষম্য, অমানবিক নির্যাতন ও হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম থেকে কী আদৌ তাদের মুক্তি মিলেছে? বেড়েছে কী তাদের জীবনের মান? যথার্থ অর্থেই পূরণ হয়েছে কী তাদের অভাব, অভিযোগ ও মৌলিক মানবিক চাহিদা? দূর হয়েছে কী তাদের দু:খ, যন্ত্রনা ও দারিদ্রতা। নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করা গেছে কী তাদের কর্মস্থল ও কর্মজীবন? কালের ব্যবধান যদিও ভিন্ন। কিন্তু, শ্রমজীবি মানুষদের অভিন্ন সেই দাবীগুলি আজও অপূরণই থেকে গেছে। শাসক, প্রশাসক ও মালিকশ্রেণী কেউই শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মানউন্নয়নে ও অধিকার সুরক্ষায় আজও আন্তরিক হতে পারেনি। পারেনি শ্রমিকদের বহুমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর শত বাতায়ন উন্মুক্ত করতে। উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত সব দেশের শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিবর্তনের শত সম্ভাবনার দ্বার এখনও প্রায়ই অবরুদ্ধ।

বাংলাদেশের শ্রমিকদের ভাগ্যের পরিণতিও প্রায় একই রকম। রাষ্ট্রীয় শাসক এবং পুুঁজিপতিদের শ্রেণী চরিত্র আজও বদলায়নি এই দেশে। বদলায়নি তাদের শোষণের ধরণ ও নির্যাতনের ধারা। মজুরী, বাসন্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মাসিক বা বাৎসরিক ছুটি সব ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের সুযোগ সুবিধা এখনও নি¤œতম পর্যায়ে। রানা প্লাজা দূর্ঘটনার ছয় বছর উপলক্ষে ‘তৈরী পোষাক খাতে সুশাসন: অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরে সম্প্রতি টিআইবি বলেছে, তৈরী পোষাক খাতের শ্রমিকদের নতুন মূল মজুরি কাঠামোতে শ্রমিকদের আয় গড়ে ২৬ শতাংশ কমেছে। সংস্থাটি আরো বলেছে, মালিকপক্ষ তাদের রপ্তানি আয় বাড়ানো ও ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে যেভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন, একই হারে শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়া হয়নি। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গত ৬ বছরে সাড়ে ১২ শ কারখানা বন্ধ হয়েছে এবং এ সময় প্রায় চার লাখ শ্রমিক কর্মচ্যুত হয়েছে যাদের বেশির ভাগই ক্ষতিপূরণ পায়নি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান একটি জাতীয় দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, রানা প্লাজা দূর্ঘটনার পর, বিশেষ করে কর্মস্থলে শ্রমিকদের অগ্নিনিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার, মাতৃত্বকালীন ছুটি, মধ্যপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নানা রকমের হয়রানি, কারখানা অটোমেশনের ফলে কাজ হারানো, মজুরিবৈষম্য, প্রকৃত মজুরি না পাওয়া এবং নিরাপত্তাবিষয়ক বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ এখনো রয়ে গেছে।

দেশের শ্রমিকরা এখনও আগুনে পুড়ে বা পদদলিত হয়ে এবং ভবন ধ্বসে মরে। আহত হয়ে বরণ করে পঙ্গুত্ব। কেউ কেউ হারায় মানষিক ভারসাম্যহীনতা। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকরা এখনও বেতন বৈষম্যের শিকার। কর্মস্থলে যৌন হয়রানিসহ তারা নানান ধরণের নির্যাতনেরও শিকার হচ্ছে। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে তারা তাদের শ্রমের কোন আর্থিক মূল্যও পায় না। বিশেষ করে কৃষি খাতে। এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের ১ কোটি ২০ লাখ নারী শ্রমিকের মধ্যে ৭৭ শতাংশই গ্রামে বাস করেন। বীজ সংরক্ষণ থেকে শুরু করে কৃষি খাতের ২০টি কাজের মধ্যে ১৭টি কাজই তারা করেন। এখাতে নিয়োজিত পুরুষের চেয়ে নারীর অবদান ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি। কিন্তু নারীর এ শ্রমকে পারিবারিক কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। এ কাজের জন্য তারা কোন আর্থিক মূল্য পায় না। নারীর অবমূল্যায়িত এই কাজের অংশ যদি জাতীয় অর্থনীতিতে যোগ করা যেত তাহলে জাতীয় উৎপাদনে নারীর অবদান ২৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪০ শতাংশ হতো। তাছাড়াও দেশের মোট শ্রমশক্তির বড় আরেকটি অংশ এখনও রয়ে গেছে আইনি অধিকার ও কাঠামোগত মজুরির নিশ্চয়তার বাইরে। যে শ্রমিকরা দেশের অর্থনীতির প্রাণ, যারা অর্থনীতির চাকা সচল রাখে, যাদের শ্রম ও ঘামে তৈরী হয় পুঁজিপতির বিত্তবৈভব, অর্জিত রেমিটেন্সে তরান্বিত হয় দেশের উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ধারা, যে শ্রমিকদের ফোটা ফোটা ঘাম জড়িয়ে আছে সভ্যতার প্রতিটি ইট, বালু ও পাথরে, যে শ্রমিকরা সভ্যতার স্তরকে এক পর্যায় থেকে ভিন্ন পর্যায়ে উত্তরণ ঘটিয়ে বিশ্বসভ্যতাকে মাথায় করে রেখেছে কর্মস্থলে তাদের জীবনের অপূরণীয় ক্ষয়ক্ষতির দায়দায়িত্ব কী সরকার, রাষ্ট্র এবং মালিক পক্ষ আদৌ বহন করছে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজা হয়তো বা অবান্তর।

কেননা যুগটা এখন ভিন্ন আঙ্গিকের। সন্ত্রাসের, পেশিশক্তির এবং অবৈধ অর্থের। ইতিহাস তাই বাঁক নিয়েছে ভিন্ন দিকে। এই যাত্রা শ্রমজীবি মানুষের খুব একটা পক্ষের নয়। বিশ্ব এখন শাসন করছে নয়াবাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদ। শাসন ও শোষণের সবকয়টি চাবিকাঠি তার কব্জায়। সমাজ ধারণ করেছে ভোগবাদী চেতনা। যেখানে আদর্শ, মানবতা, নীতি, নৈতিকতা নিয়মিত নিলামে ওঠে। যে সর্বোচ্চ দামে কিনে নিতে পারে তারই জয় সর্বত্র। রাজনীতিতে গণতন্ত্রের নামে চলছে আত্মতন্ত্রের মচ্ছব। শ্রমজীবি ভুবনে বিরাজ করছে লুম্পেনদের রাজত্ব। এই বাস্তবতায় ট্রেড ইউনিয়ন শব্দ দু’টি এখন অতীব লজ্জার। অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও লুম্পেন শ্রমিক রাজনীতি ও ট্রেড ইউনিয়ন রাজনীতির সর্বাধিক বিকাশ ঘটায় শ্রমিক অঙ্গনে অন্তর্দ্বন্দ্ব, ঢালাও অর্থের লেনদেন, শ্রমিক স্বার্থের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সমাজতন্ত্রের অবস্থান রক্ত মাংশ শূণ্য কঙ্কালসার। তার আওয়াজ ও শ্রেণী সংগ্রামের চেতনা আগের মত হৃষ্টপুষ্ট নয়। যারা একসময় শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখতেন, শ্রমিকদের অতিবিপ্লবী বানানোর চেষ্টা করতেন তারাও এখন ইতিহাসের ভিন্ন বাঁকে অবস্থান নিয়েছে। সমাজতন্ত্রের খোলস ঝেড়ে পুঁজিবাদের দোসর সেজেছে। শ্রমিক সংঘ এখন তাদের বিত্তবৈভব গড়ে তোলার কাজে ব্যবহার হচ্ছে। শ্রমিক নেতৃত্বও এখন রাতের অন্ধকারে মালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নিজেদের ভাগ্য গড়ে নিচ্ছে। ফলে প্রান্তিক শ্রমিকের দুরাবস্থা সেই আগের মতই রয়ে গেছে।

মে দিবস যদিও শ্রমিকদের একটি পবিত্র দিন। কিন্তু তা ভক্তিবাদের নয়, প্রতিবাদের। এই একটি দিনেই একাট্টা হয় শ্রমজীবি শ্রেণী। তবে দিবসটি আনুষ্ঠানিকতার ভারে এখন এতটাই জর্জরিত যে, এর মধ্যদিয়ে এখন আর শ্রেণীচেতনার বিদ্যুৎ বেরিয়ে আসতে দেখা যায়না। এই দিবসটি এখন আর সাহায্য করেনা শ্রেণী সংগ্রামের আগুন জ্বালাতে। আজও পারেনি সমাজ পরিবর্তনের সেই কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছাতে। তাই মে দিবস ঐতিহাসিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হলেও এই দিনের আবেদন এবং গুরুত্ব মেহনতি ও শ্রমজীবি মানুষের নিকট কেবল মøানই নয় যেন এক মৃত দিবসের শোকার্ত অনুষ্ঠান। রোমন্থন ও শ্লোগান।

সহযোগী অধ্যাপক, ইউডা।