মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক মানুষদের মডেল

মুতাসিম বিল্লাহ নাসির, 

সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার মুন্সিগঞ্জে জন্ম মেজবাউল হকের। বাবা আব্দুল আজিজ সরদার একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের স্কুলের শিক্ষক। মা মাহাফুজা আক্তার একজন গৃহিনী। বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে মেজবাহ, তবে একটা বোন ছিল ছোট থাকতেই নিউমোনিয়াতে আক্রান্ত হয়ে না ফেরার দেশে চলে যায়। ‘তখন থেকেই বাবা-মা আমাকে ঘিরেই স্বপ্ন দেখতেন’ জানালেন মেজবাহ।

‘ইচ্ছা থাকার সত্ত্বেও আব্বু বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেনি। যেহেতু তিনিও একজন মানুষ গড়ার কারিগর তাই লেখা পড়ার মর্যাদাটা বুঝতেন সবসময়। আর সবসময় উৎসাহ দিতেন এই ব্যাপারে। আমার আব্বুর ২টা আফসোস ছিল সবসময়, এক বেশিদূর পড়াশোনা করতে না পারা। দুই, দ্রুত কথা বলতে গেলে কথা বাধে’ কিন্তু এ নিয়ে যেন সন্তানের কোনো আফসোস যেন না থাকে সে কারনে সব সময় তিনি চাইতেন আমি যেন ভাল লেখাপড়া করি এবং সেই সাথে আমি যেন মানুষের সামনে আসি বা সবার সামনে কথা বলি বা বিভিন্ন অ্যাক্টিভিটিসে অংশগ্রহণ।’

তাই ক্লাস সেভেন থেকেই জোবেদা সোহরাব মডেল একাডেমী স্কুল স্কাউটসে যুক্ত হোন মেজবাহ। ওটাই ছিল তার এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসের শুরু। তারপর থেকে মাঝে মাঝে স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করাসহ অনেক অনেক প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার সুযোগ ঘটে।ছোটবেলা থেকেই গল্পের বইয়ের নেশা ছিলো কিন্তু সুযোগ ছিলো কম। মেজবাহ এর ভাষায়,

‘স্কুলের একটা রুম ব্যবহৃত হতো পাবলিক লাইব্রেরী হিসাবে। কয়েকটা পুরানো কাঠের আলমারিতে অনেক  পুরানো বই ঠেশে ভর্তি করা। স্কুল লাইফটা হোস্টেলেই ছিলাম। গল্পের বই পড়ার খুব শখ ছিল কিন্তু তখনো কোন উপন্যাস বা বড় বই পড়া হয়নি। ক্লাস এইটে থাকতে একদিন জানালা দিয়ে ঐ রুম থেকে একটা বই চুরি করি।  অতঃপর পড়ে ফেললাম জীবনের প্রথম উপন্যাস। বইটা পড়ে তারপর মনের মধ্যে দেশের বাইরে পড়তে যাওয়ার একটা সুপ্তবাসনা তৈরি হয়ে গিয়েছিলো । বইটা ছিল হুমায়ূন আহমেদের “হোটেল গ্রেভারিন”।

কলেজ ছিলো শ্যামনগর মহসিন ডিগ্রি কলেজ, এরপর ঢাকাতে ইউনিভার্সিটি চান্স পেতে ভর্তি কোচিং করার জন্য যাওয়া। জীব বিজ্ঞান খুব ভাল লাগতো। খুব ইচ্ছা লাইফ সাইন্সের কোন একটা সাবজেক্টে পড়ার। অনেকগুলো ইউনিভার্সিটির ফর্মও কেনা হয়েছিলো কিন্তু পরীক্ষা দেওয়ার আর সুযোগ হয়নি। জন্ডিস হওয়ায় প্রচণ্ড অসুস্থ হয়েই চলে যেতে হয় বাসায়। এদিকে বাবারও  সামর্থ্য ছিল না প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়ানোর। নানা, মোঃ মুজিবুর রহমান ও নানি হেনা  রহমান অনেক সাহস দিলেন।

‘আমার নানা বললেন তিনি সব খরচ দিবেন পছন্দের সাবজেক্টেই যেন ভর্তি হই। দূরসম্পর্কের কিন্তু অনেক কাছের “আশিক মামা” তখন ইউডাতে কম্পিউটার সাইন্সে অনার্স পড়তেছেন। ওনার পরামর্শে এবং সহযোগিতায় ইউডাতে ভর্তি হই, ফার্মেসী ডিপার্টমেন্টে ২০০৭এ। তখন গ্রামের অনেকে অনেক ছোট করে কথা বলতো, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে টাকা দিলে সার্টিফিকেট পাওয়া যায় এমন কথাও শুনেছি প্রতিবেশিদের কাছ থেকে। ততদিনে বাইরের দেশে পড়তে যাওয়ার ইচ্ছাটা আরও জমে বসেছে মনের মধ্যে, কারন ওইসব কথার জবাব কাজের মাধ্যমে দিতে হবে।’

তবে সেকেন্ড ইয়ারের শেষ দিকে মেজবাহ উপলদ্ধি করলেন, উচ্চশিক্ষার জন্য বাইর পড়তে গেলে অনেক যোগ্যতাই থাকতে হবে। তার মধ্যে বিশেষকরে কয়েকটা সাইন্টিফিক আর্টিকেল থাকা জরুরি। তবে আগ্রহ আর চেষ্টায় সে সুযোগ ও মিলল। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহাবুদ্দিন স্যার এর সহযোগিতায় তার ফার্মাকোলজি ল্যাবে কাজ করার সুযোগ পেলেন মেজবাহ।

রিসার্চ সম্পর্কে বোঝাপড়া না থাকলেও প্রতিসপ্তাহে যেতেন। উদ্দেশ্য একটাই, এটা করলে আমার বাইরে পড়তে যাওয়ার এক ধাপ পার হতে পারবো। অনার্সের চতুর্থ বছরে এসে বুঝলেন দেশের বাইরে পড়া যায় ২ ভাবে। এক নিজের টাকা দিয়ে, দুই, পরিপূর্ণ শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে।

যেহেতু টাকা দিয়ে পড়তে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব তাই স্কলারশিপই ছিলো শেষ ভরসা। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে মনের মধ্যে একটা চাপা ভয় কাজ করতো তার। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হয়ে স্কলারশিপ পাওয়া যাবে তো! কিন্তু তখন তার নিজের মানসিক অবস্থা ছিলো দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার মতো। তাই তখন থেকেই শিক্ষাবৃত্তির বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন।তাতে যতটুকু বোঝা গেল শিক্ষাবৃত্তি পেতে গেল কয়েকটি বিষয় লাগবে। প্রথমত, ভাল রেজাল্ট ও মৌলিক জ্ঞান, দ্বিতীয়ত, আইএলটিএসে ভাল স্কোর। তৃতীয়ত, গবেষণাধর্মী নিবন্ধ জার্নালে প্রকাশ। এগুলো থাকলে মোটামুটি নিজেকে বাইরে পড়তে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত বলা যায়। খোঁজ-খবর নিয়ে আরও যতটুকু জানাগেল, বাইরের দেশে এক্সট্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসকে অনেক গুরুত্ব দেয় শিক্ষাবৃত্তি পেতে।

আগে থেকেই মেজবাহ বিভিন্ন ভলেণ্টারি কাজ করতেন। এখন আরও বেশি করে কাজ শুরু করলেন। একদিন খবরের কাগজে দেখলেন “রোটারি ইন্টারন্যাশনাল” নামের এক সমাজসেবক সংগঠন দেশের বাইরে মাস্টার্স করার জন্য স্কলারশিপ দেয়। রোটারি ক্লাব অব ধানমণ্ডিতে গিয়ে দেখেন ক্লাবে মেম্বার হতে মিনিমাম বয়স লাগে ৩০ বছর। মনটা তার একটু খারাপ হলেও  তথ্য জানা গেল তাদের একটা সংগঠন আছে ইয়াংদের জন্য নাম “রোটার‍্যাক্ট”। তখন তার অফিস ছিলো মোহাম্মাদপুরের আওতাধীন ‘রোটার‍্যাক্ট ক্লাব অফ শ্যামলী-ঢাকা । সেখানে যোগদান করেন মেজবাহ। তার আগ্রহ আর কার্যক্রম তাকে  ২ বছরের মধ্যে ঐ ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পদে উন্নীত করল। এর পাশাপাশি মেজবাহ ইউনিভার্সিটিতে থাকতে কয়েকটা ফ্রি আই ক্যাম্পে ভলেনটিয়ার হিসাবে কাজ  করেছেন। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটিতে প্যালিয়েটিভ কেয়ার ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্রেনিং নিয়ে ওখানেও কিছুদিন ভলেনটিয়ার হয়ে কাজ করেছেন। ইউডার “ছাত্র সংসদ” এর সেন্ট্রাল লিডার হিসেবে দায়িত্বপালন করেছেন। বিভাগে বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে বের হওয়া স্মারকগ্রন্থের সম্পাদক ছিলেন। শিক্ষাজীবনের শেষ দিকে এসে যৌথভাবে ইউডার আরেকজন সিনিয়র শিক্ষার্থী মিলে ফেসবুকে ইউডা ভার্চুয়াল ব্লাড ব্যাংকের গ্রুপ তৈরি করেন। এটি এখন অনেক বড় রক্তদাতা সংগঠন। এর পাশাপাশি মেজবাউল হক কাজ করেছেন জাগো ফাউণ্ডেশান, ভলেনটিয়ার ফর বাংলাদেশ সহ অনেক সংগঠনের সাথে। মেজবাউল হক মনে করেন, তার জীবনের অনেকটা প্রভাব আছে এই সকল এক্সত্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস এর। 

মেজবাহ বিফার্ম শেষ করেন ২০১১ এর শেষ দিকে।চাকুরি জীবন আর দেশের বাইরে যাওয়ার চিন্তা তখন তাকে চিন্তিত করে রেখেছিলো। ইউডা লাইফ সায়েন্স এর ডিন স্যারের পরামর্শ অনুযায়ী কিছু এথনোবোটানিক্যাল বা মেডিসিনাল প্লান্ট নিয়ে কাজ করেন বন্ধু শাহেদকে সঙ্গে নিয়ে। বান্দরবানে মুরং উপজাতিদের কলোনিতে যান সেখানে তাদের সাথে দুই দিন থেকে তাদের একমাত্র কবিরাজের কাছ থেকে অনেক ধরনের ঔষধি গাছ নিয়ে ঢাকায় ফেরেন। পাশাপাশি ইউডা বায়োটেকনোলজি ল্যাবেও চলে কিছু কাজ।

এর মধ্যে নর্দার্ন ইউনিভার্সিটির অঙ্গপ্রতিষ্ঠান “নিউল্যাব মেডিক্যাল টেকনোলজি ইনিস্টিটিউটে” ভিজিটিং টিচার হিসাবে জয়েন করেন। নিজের জমানো টাকা দিয়ে আইএলটিএস পরীক্ষা দেন। আবেদন করার মতো মোটামুটি রেজাল্টও পেয়ে যান। এদিকে ডিন স্যারের সাথে করা কাজগুলোও একটা অনলাইন জার্নালে প্রকাশ হয় ২০১২ এর শেষ দিকে। তখন মেজবাউল হকের মনে মনে ভাবনা স্বপ্নের পথে আরও এক ধাপ অগ্রগতির। এ বছরের দিনগুলো কাটত খুবই সঙ্কটের মধ্যে। ২০১৩ এর জুন মাসে প্রথম সুখবর টা আসে তাইওয়ান এর ন্যাশনাল চাই ইউনিভার্সিটি থেকে। একজন প্রফেসর মেজবাহকে তার ল্যাবে নিতে ইচ্ছুক। সাথে দিবে পুর্ণাঙ্গ শিক্ষাবৃত্তি (ইন্টারন্যাশনাল গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট স্কলারশিপ)। এতদিনের মনের কষ্ট আর এতকিছু করা সব সার্থক হয়ে গেল ঐ মুহূর্তে, হেসে হেসে অনুভূতি জানালেন ক্যাম্পাস ফিচারকে।

তাইওয়ানে কাজের বিষয়ে মেজবাহ জানান, ‘আমি কাজ করতাম, মাত্রাতিরিক্ত আর্সেনিক পানি পান করার কারনে আমাদের ব্লাডার ক্যান্সার হতে পারে, এই আর্সেনিক দ্বারা ব্লাডার ক্যান্সার হওয়ার যে বায়োমার্কার সেগুলো আইডেণ্টিফিকেশান সম্পর্কিত কাজ। সফল ভাবে জীবনের সুন্দরতম দুটি বছর পার করেছি তাইওয়ানে। ২য় বর্ষে আমাদের ইউনিভার্সিটির ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশানের সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলাম। একই বছর ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট ফেস্টিভ্যালে ১৫০ প্যাকেট বাংলাদেশী খাবার রান্না করি এবং বাংলাদেশ নিয়ে একটা পোস্টার প্রেজেন্টেশান করি। আমার পোস্টারটাই প্রথম স্থান পায় যদিও আমি একমাত্র বাংলাদেশী ছিলাম আমাদের ইউনিভার্সিটিতে।’

গ্রাজুয়েশন এর আগে বার্ষিক রিসার্চ পোস্টার প্রেজেণ্টেশানে তার পোস্টার প্রথম স্থান অধিকার করে। সব থেকে খুশির সংবাদ ছিলো, গ্রাজুয়েশান ডে তে ২জন স্টুডেন্ট “ডিসটিংগুইস্ট স্টুডেন্ট সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড” পেয়েছিলো, এর একজন ছিলেন মেজবাহ। ওখানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের আরও সুযোগ সৃষ্টিতে মেজবাহ ফেসবুকে একটা গ্রুপ তৈরি করেন “বাংলাদেশী স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশান”, এই গ্রুপ থেকে তাইয়ানে পড়তে ইচ্ছুক স্টুডেন্টদের হেল্প করা হয়। এটাই প্রথম এবং একমাত্র। মেজবাহের আক্ষেপ ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি পাবলিক ইউনিভার্সিটি বলে তর্ক না করে সবাইকে সুযোগ করে দিন সবার মধ্যেই কিছু না কিছু করে দেখানোর পটেনশিয়ালিটি আছে।’

এরপরে দেশে ফিরে অনেক হিসেব নিকেশ করে ২য় মাস্টার্স করার সিদ্ধান্ত নেন মেজবাহ। স্পেনের ইউনিভার্সিটি অফ জায়েনে  বায়োটেকনোলজি ও বায়োমেডিসিনে ৯ মাসের একটা মাস্টার্স প্রোগ্রামে স্কলারশিপ অ্যাপ্লিকেশন এর সংবাদ পান। আবেদন করে স্কলারশিপও পেয়ে যান। এটি ছিলো ইউনিভার্সিটি ট্যালেন্ট স্কলারশিপ।

২০১৭ এর সেপ্টেম্বরে স্পেনে চলে আসেন। এখানেও ভলেন্টিয়ার কাজের সাথে যুক্ত আছেন। ফুড ব্যাংক অফ জায়েন, ইকো ক্যাম্পাস, জায়েন গভর্নমেন্ট ওল্ডহোম, রেড ক্রসে ভলেন্টিয়ার হিসাবে কাজ করছেন। এমনকি স্প্যানিশ হোস্ট ফ্যামিলি প্রোগ্রামেও অংশ নেওয়ার সুযোগ হয় তার। এই প্রোগ্রামেই জীবনে প্রথম বারের মত নিউজপেপারে নিজেকে নিয়ে রিপোর্ট দেখে হৃদয় শিহরিত হয়। পরবর্তীতে একটা একটা স্প্যানিশ টিভি প্রোগ্রামেও অংশগ্রহণ করেন। এর মাধ্যমে Erasmus in School এবং Studyportal Student League এর স্টুডেন্ট এম্বাসেডর হিসেবে কাজ করছেন তার বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বাইরের দেশের ইউনিভার্সিটি মানে শুধু যে বই পড়ার জায়গা তা না। এখানে ইউনিভার্সিটি মানেই অপরচুনিটি। সবসময় কোন না কোন কম্পিটিশান বা প্রোগ্রাম লেগেই থাকে। এমনকি প্রতিমাসে আমাদের ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টদের জন্য ফ্রি বিভিন্ন জায়গা ভ্রমণের ব্যাবস্থা করে ইউনিভারসিটি। প্রথম সেমিস্টারে আমি “Explorer” নামের একটা উদ্যোক্তা প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহন করি । আমাদের ইউনিভার্সিটি থেকে ২০ জনের ব্যবসায়িক প্লান সিলেক্ট করা হয়। তার মধ্যে আমারটা ছিল। বলছিলেন মেজবাহ।

ওখানে ৬ মাসের একটা অন্ট্রিপ্রেনেউরশিপ কোর্স করার সুযোগ পান মেজবাহ। তার বিজনেস প্লান, থিসিস প্রোজেক্ট এবং সব অ্যাক্টিভিটিস দেখে ইউনিভার্সিটি প্রেসের সাপ্তাহিক নিউজপেপারে বড় করে ফিচারি করে তাকে নিয়ে। “An Optimistic Bangladeshi Student” এই শিরোনামে। দ্বিতীয় সেমিস্টারে সে এক মাসের একটা ইন্টার্নশিপ করে ইউনিভার্সিটিতেই। এবং একই সাথে ২টা স্কলারশিপ পায়। একটা ইন্টারন্যাশনাল মোবিলিটি গ্রান্ট, University of Guadalajara, মেক্সিকোতে। দুই, ইউনিভার্সিটি অফ বোলোনিয়াতে। স্পেনে তার থেসিস টপিক ছিল “নন কোডিং আরএনএ” এর কারনে আমাদের হার্টএর যেসকল পরিবর্তন হয় এবং ডিজিজ হয় সেসকল জিন এনালাইসিস করা। ফাইনালি স্পেনের মাস্টার্স শেষ করে এবং মেক্সিকোর স্কলারশিপটা বাদ দিয়ে প্রিডক্টরাল প্রোগ্রামে চলে আসে ইটালিতে, ইউনিভার্সিটি অফ বোলোগনিয়াতে। (The University of Bologna, The oldest university in the world) যার বয়স প্রায় এক হাজার বছর। ১০৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত। ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি রাঙ্কিং এ ১৮২তম। ৩ জন নোবেল জয়ী এবং ৪ জন পোপের ইউনিভার্সিটি এটি।

মেজবাউল হক বলছিলেন,  রেডিও আবিষ্কার করেন “মার্কোনী”, আর বড় হয়ে সেই “মার্কোনী” যে ইউনিভার্সিটিতে পড়েছেন এবং যেখানে থেকেই রেডিও আবিষ্কার করেছেন সেই ইউনিভার্সিটিতে পড়তে পারবো কখনো ভাবিনি কিন্তু আজ আমিও সেই ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট। এখনে স্টুডেন্ট সংখ্যা ৮৫,৫০০ জন। যে কারনে ইতালির এই Bologna শহরকে বলা হয় “The City of Student”.  তার ভাষায় ‘অন্তত নাতি নাতনীদের বলতে পারবো আমি বিশ্বের সবথেকে পুরানো ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট ছিলাম একসময়। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া আমার মত মধ্যবিত্ত দেশের, মধ্যবিত্ত ফ্যামিলির, মধ্যবিত্ত একটা প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে পড়া, মধ্যবিত্ত এক স্টুডেন্টকে এই সুযোগ দেয়ার জন্য। 

তার সফলতার সূত্র নিয়ে মেজবাহের বক্তব্য হলো, আমি অতি সাধারণ একজন স্টুডেন্ট তবে আমি আমার স্বপ্নের সাথে তাল মিলিয়ে পরিশ্রম করি। চেষ্টার কখনো ত্রুটি রাখি না। কারন আমি জানি স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি যদি স্বপ্নপূরণের জন্য কাজ না করলে সেটা শুধু সপ্নই থেকে যায়। ইউনিভার্সিটি লাইফের শুরুর দিকেই আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা উচিৎ। উচ্চশিক্ষা করবো নাকি চাকুরি। ভালো চাকুরি পাওয়া কঠিন তাই উচ্চশিক্ষা বেছে নিলাম এমনও করা যাবে না। জব বেছে নিলে শুধু জব এর জন্য প্রিপারেশন নিতে হবে। উচ্চশিক্ষা করতে চাইলে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা করতে হবে। একবারে সব পরিকল্পনা এক সাথে মাথায় নেয়া যাবে না। এক এক করে ধাপ পার হতে হবে। তাহলে কাজ গুলো সহজ হবে।

‘এখন বেশির ভাগ স্টুডেন্টই ফেসবুক, ইউটিউব, বয়ফ্রেন্ড, গার্লফ্রেন্ড এই বৃত্তের মধ্যে বন্দী হয়ে গেছে। এগুলোর বাইরেও অনেক সুন্দর সুন্দর কাজ আছে করার মত। আমি বলবো শুধু ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টই না, স্কুল লেভেল থেকেই সবারই উচিৎ ভলেনটিয়ার কাজের সাথে জড়িত হওয়া। শুধু বই পড়ে লাইফে পিওর সাকসেস হওয়া যায় না।’ মধ্যবিত্ত স্বাপ্নিক মানুষের জন্য মেজবাউল হকের পরামর্শ হলো, মধ্যবিত্ত শিক্ষার্থী আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী যারা অনেক বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখি বা উচ্চশিক্ষার জন্য দেশের বাইরে যেতে চাই, তাদের নিজের কোথায় কমতি আছে সেটা আগে খুজে বের করে লিস্ট করতে হবে। তারপর এক এক করে তা পূরণের চেষ্টা করতে হবে।পরিস্থিতি যাই হোক না কেন হাল ছাড়া জাবে না। আর এই হাল ধরে রাখার জন্যই বেশি এক্সত্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে জড়িত হতে হবে।যেন মনোবলে কখনো কমতি না হয়। যদি রেজাল্ট একটু কম থাকে তাহলে ইংরেজির দক্ষতা দিয়ে বা রিসার্চ এক্সপেরিএন্স দিয়ে সেটা পূরণ করতে হবে। যদি রিসার্চ এক্সপেরিএন্স কম থাকে তাহলে ভলেন্টিয়ার কাজ বা এক্সত্রাকারিকুলার অ্যাক্টিভিটি দিয়ে সেটা কাভার দিতে হবে। তবুও হাল ছাড়া যাবে না। সবসময় একটা কথা মনে রাখতে হবে “There is a way”. এটা মনে রাখলে আর হতাশায় ধরবে না কখনো ”