বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং বাড়াতে প্রবাসী গবেষকদের দেশে ফেরাতে হবে

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং অনেকগুলো প্যারামিটারের উপর নির্ভর করে। তার মধ্যে রয়েছে বছরভেদে মোট পাব্লিকেশন সংখ্যা, সাইটেশন, উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত (পোস্টগ্রাজুয়েট) শিক্ষার্থীদের সংখ্যা, ছাত্র-শিক্ষকের অনুপাত, গবেষণা খাতে গড় বরাদ্দ, ডিগ্রি শেষে এলামনাইদের বিষয়বিত্তিক চাকুরিতে সাফল্য, ইত্যাদি।

বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ই গভীরভাবে ভাবে কীভাবে নিজেদের র‌্যাংক উপরে তোলা যায়, তা নিয়ে তাদের মাস্টারপ্ল্যান থাকে। কারণ ভালো র‌্যাংকের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র, শিক্ষক এবং এলামনাইদের দামই থাকে আলাদা। সুনামের কারণে সেখানে গবেষণা অনুদানও পাওয়া যায় তুলনামূলক বেশি, আর গবেষণায় সাফল্যের কারণে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কোলাবোরেশনও তাই সেখানে বেশি।

র‌্যাংকিং উপরে তোলার জন্য তাদের অন্যতম টার্গেট থাকে ভালো গবেষকদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেয়া। অর্থাৎ যাঁদের পিএইচডি ও পোস্টডক আছে, মানসম্পন্ন জার্নালে  পাব্লিকেশন রয়েছে, তাঁদেরকে তারা নিয়োগ দিতে চান। মোটা দাগে বললে বলা যায় গবেষণায় অভিজ্ঞদের মূল্যায়ন সেখানে সবার আগে (অনেক ক্ষেত্রে একাডেমিক রেজাল্টের থেকেও এগিয়ে)।

এখন আমাদেরও সময় হয়েছে পুরনোকে ঝেড়ে নতুন চিন্তার দিকে আগানোর। অর্থাৎ বিশ্বের সব দেশের কাছে  দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আপেক্ষিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানো। আর তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের র‌্যাংকিং এর উন্নয়ন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপক। একথা মনে রাখতে হবে যে আমরা এতদিন যেভাবে চলেছি বা চলছি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সেভাবেই চলতে/চালাতে থাকলে বড় আকারের র‌্যাংকিং উন্নয়ন প্রায় অসম্ভব। আমাদের লক্ষ্য কি তা আগে ঠিক করতে হবে। অর্থাৎ র‌্যাংকিং উন্নয়নের উদ্দেশ্যে ৫ বছর, ১০ বছর এবং ২০ বছর মেয়াদী মাস্টারপ্ল্যান (গবেষণালব্ধ) সেট করতে হবে সবার আগে। নিয়োগ, প্রমোশনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে মানসম্পন্ন গবেষণাকে সবার আগে গুরুত্ব দেয়ার নিয়ম থাকতে হবে। একইসাথে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের গবেষণাকর্ম সুচারুভাবে সম্পন্ন করার জন্য প্রয়োজনীয় ফান্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।

দেশের প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আধুনিক সেন্ট্রাল ল্যাব করা প্রয়োজন, যেনো প্রতিটি বিভাগের গবেষকরা তা ব্যবহার করতে পারেন।

আমার ছোট অভিজ্ঞতায় যা মনে হয়েছে, তা হলো – যতদিন ব্যতিক্রমী (অধিকতর যোগ্য) গবেষকদের আমরা দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করবোনা, ততদিন আমরা গুণগত উন্নয়নে পিছিয়ে থাকবো বলেই ধরে নেয়া যায়। বিশ্বের নামকরা সব বিশ্ববিদ্যালয়ই সর্বশেষ ডিগ্রি, গবেষণা ইত্যাদিকে সবার আগে প্রাধান্য দেয়। নতুন নিয়োগের ক্ষেত্রে এটাই তাদের সবচেয়ে গবেষণালব্ধ ও ফলপ্রসূ নীতি। হ্যা, সেই সাথে ডেমো ক্লাসও নিতে হয় অনেক ক্ষেত্রেই।

আমাদের ভালো মানের পিএইচডি ও পোস্টডক এবং ভালো পাব্লিকেশন থাকলে তবেই বাইরের ভার্সিটিগুলোতে আমরা যোগ্য  ক্যান্ডিডেট হিসেবে বিবেচিত হই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সেখানে আমাদের  বি.এস.সি, এমনকি কখনো কখনো এম.এস.সি এর ব্যাপারটাও মূখ্য থাকেনা তখন।

আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর র‌্যাংক উপরে তুলতে হলে সেসব ব্যতিক্রমধর্মী গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিশেষ পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় চায়না, ইন্ডিয়া এবং পাকিস্তান এখন এ বিষয়টা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছে – এবং উচ্চতর ডিগ্রিধারীদের নিজ নিজ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য তারা নানা ধরণের পদক্ষেপও গ্রহণ করেছে।

হ্যা, আমাদের দেশে মাস্টার্স পাশকারীদের নিয়োগের ক্ষেত্রে একাডেমিক রেজাল্টের  ব্যারিয়ার থাকা জরুরি। তবে এস.এস.সি বা এইচ.এস.সির রেজাল্টের ব্যারিয়ার রাখার প্রয়োজনীয়তা আছে কিনা, তা ভেবে দেখার বিষয়। আবার মাস্টার্সেই কেউ গবেষণায় ভালো করলে নিয়োগের ক্ষেত্রে তার সুযোগ অধিকতর উন্মুক্ত করা দরকার। অন্যদিকে, একজন মাস্টার্স এবং একজন পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে যদি একই পদে নিয়োগ দেয়া হয়, তবে তা কি ওই পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে বঞ্চনা করার সামীল হবেনা? কেন একজন ভালো গবেষক বঞ্চনা নিতে দিশে ফিরতে চাইবে? তার ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতার উপযুক্ত মূল্যায়ন, দেশের সর্বস্তরে তাঁর সম্মান নিশ্চিতকরণ, ভবিষ্যতে গবেষণাকর্মের জন্য ভালো পরিবেশ দেয়া এবং সম্মানজনক বেতনের নিশ্চয় প্রদান – এগুলো থাকলে তবেই মেধাবী গবেষকগণ দেশে ফিরতে আগ্রহ পাবেন।

স্কুল-কলেজের শিক্ষকতা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার পার্থক্য বুঝে গবেষণার মানোন্নয়ন প্রয়োজন।

বিনয়ের সাথে আবারো বলতে চাই, আমরা যদি ভবিষ্যতে আমাদের দেশকে এগিয়ে নিতে চাই, তাহলে শিক্ষা ও গবেষণা খাতের মানোন্নয়ন সবার আগে জরুরি। আর তাই সবার আগে কোয়ালিটি পিএইচডিধারী ক্যান্ডিডেটদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য উদ্যোগ জরুরি। তাহলেই তাঁরা দেশে ফিরে আসার উৎসাহ পাবেন, আর তখন নিয়োগে প্রতিযোগিতা বাড়বে। সেক্ষেত্রে বর্তমান শিক্ষার্থীরাও অনার্স/মাস্টার্স শেষ করে সবার আগে নিজ যোগ্যতা বাড়াতে (মানসম্পন্ন উচ্চতর ডিগ্রি নিতে) উদ্যোগ নেবে।

শিক্ষা, গবেষণা ও নিয়োগের ক্ষেত্রে আমাদের প্রচলিত পলিসি বা নীতিনির্ধারণীর গবেষণালব্ধ আপডেট করতে পারলে  তবেই আমাদের দেশের ভার্সিটিগুলোর র‌্যাংক উপরে উঠবে, আর তা না হলে আমাদের জীবদ্দশায় এখনকার মতই করুণ র‌্যাংকিং দেখে যেতে হবে। সেজন্য ভারত, মালয়েশিয়া, সিংগাপুরকে দেখেও আমরা ধারণা নিতে পারি। অতীতের পদ্ধতি পরিবর্তন না করলে আমরা আপেক্ষিকভাবে বিশ্বমানে অতীতেই রয়ে যাবো।

যদি শিক্ষা ও গবেষণা সম্পর্কিত সব ধরণের নীতিনির্ধারকদের তালিকায় শুধুমাত্র সেসব প্রফেসরদেরকেই রাখা হয়, যাঁরা বিশ্বের টপ ভার্সিটিগুলো থেকে পিএইচডি ও পোস্টডক করে এখন আমাদের দেশে সক্রিয় গবেষণায় রয়েছেন, তাহলেই  এক্ষেত্রে প্রত্যাশিত ফলাফল আশা করতে পারি আমরা।

গুণী ও ব্যতিক্রমধর্মীদের চেনা এবং তাদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করার পদ্ধতি চালু করা ব্যতীত বিশ্বমানে দীর্ঘ মেয়াদে শিক্ষা ও গবেষণায় অগ্রগতি কি আদৌ সম্ভব হবে?

আমরা কেউই চিরস্থায়ী নই।কিন্তু দেশ ও দেশের ভবিষ্যত প্রজন্মকে বাঁচার মত বাঁচতে দিতে চাইলে বিষয়টা গভীরভাবে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

লেখক: বুয়েটের শিক্ষক, পিএইচডি গবেষক, ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, যুক্তরাষ্ট্র।