ফড়িং ও আমাদের প্রকৃতি

মোঃ মনোয়ার হোসেন,

ফড়িং একটি নান্দনিক পতঙ্গ। ফড়িঙের সাথে আছে চোখ জুড়ানো সূচ ফড়িং। এদের রয়েছে দুইটি বৃহৎ যৌগিক চোখ, দুই জোড়া শক্তিশালী স্বচ্ছ পাখা ও ছয়টি পা। পায়ের বিশেষ সঞ্চালনের জন্য ফড়িং স্থির অবস্থা থেকে হঠাৎ উড়তে পারে। অন্যদিকে পাখাগুলোর গতি বাড়িয়ে দ্রুত ডানে-বাঁয়ে দিক পরিবর্তন করতে পারে। ফড়িং ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটারেরও অধিক বেগে উড়তে পারে। এই পতঙ্গের বিচিত্র উড়ার গতি ও বেগ দেখে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে হেলিকপ্টার তৈরি করেছিলেন। আর তাই প্রকৃতির মধ্যে ফড়িং -ই একমাত্র পতঙ্গ, যার চেহারা, উড়ার গতি ও বেগের সঙ্গে মিল আছে হেলিকপ্টারের।

ফড়িং হলো পৃথিবীর অন্যতম প্রাচীন উড়ন্ত পতঙ্গ। শুধু অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া পৃথিবীর সব জায়গায় ফড়িঙের দেখা মেলে। বিশ্বে প্রায় ৬০০০ প্রজাতির ফড়িং রয়েছে। তারমধ্যে, ভারতে প্রায় ৫০০ প্রজাতির ফড়িং রয়েছে। আর বাংলাদেশে রয়েছে প্রায় ১৫০ প্রজাতির ফড়িং। দেশের সব অঞ্চলে, বিশেষ করে জলাশয়ের পাশে ফড়িং দেখা যায় তবে পাহাড়ে ও পাথুরে জলাশয়ের পাশে ভিন্ন রং -এর বৈচিত্র্যময় ফড়িং -এর আধিক্য চোখে পড়ে। তবে, সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের ফড়িঙের বৈচিত্র্য উল্লেখযোগ্য।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় নৈসর্গিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি। এখানে রয়েছে অনেক লেক, পুকুর ও জলাশয়। এই ক্যাম্পাসে জলাশয় রয়েছে, আর তাই দেশের প্রায় এক তৃতীয়াংশ ফড়িং ও সূচ ফড়িং দেখা যায় এই ক্যাম্পাসে। উল্লেখযোগ্য ফড়িঙের মধ্যে ডিচ্ জুয়েল, কোরাল টেইল্ড ক্লাউডউইং, পাইড প্যাডি স্কিমার, কমন পিকচার উইং, গ্রেটার ক্রিমসন গন্ডাইডার, কমন ক্লাব টেইল, গ্রিন মার্শ হাউক ও রুফাস মার্শ গন্ডাইডার, উল্লেখযোগ্য। অন্যদিকে সূচ ফড়িঙের মধ্যে ব্ল্যাক কিনড ফেদেরলেগস ও অরেনজ টেইল্ড মার্শ ডার্ট প্রজাতিদ্বয় সারা বছরই দেখা যায়। এছাড়াও রয়েছে করোম্যানডাল মার্শ ডার্ট, প্রুনোসেড ডার্লেট, ইন্ডিয়ান হুডেট ডার্লেট এবং পিগমি ডার্লেট। জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত ফড়িং খুব চোখে পড়ে। এ সময় প্রকৃতিতে এদের খাবার বিশেষ করে পোকা-মাকড়ের প্রাচুর্যতা বেশি থাকে।

পূর্ণাঙ্গ ফড়িং ডিম পাড়ে পানিতে ও পানিতে অবস্থিত ঘাসগুলোতে। ডিম থেকে এর লার্ভার (নিম্ফ) জন্ম হয় পানিতে। অতঃপর, সেই পানি থেকে নিম্ফ বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে পূর্ণাঙ্গ ফড়িঙে রূপান্তরিত হয়ে পানি থেকে ডাঙায় উঠে আসে। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ ফড়িংকে সাধারণত পানির কাছাকাছিই বেশি দেখা যায়। প্রজাতি-ভেদে ফড়িং একদিনে ২৫ থেকে ৩৫ কিলোমিটার পর্যন্ত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে।

ফড়িং আমাদের বাস্তুসংস্থানের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি পতঙ্গ। এটি ফসলের নানা ধরনের ক্ষতিকর পোকা-মাকড় খেয়ে আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে ও অর্থনৈতিকভাবে উপকার করে। ফড়িং উড়ন্ত অবস্থাতে শিকার করে অভ্যস্ত। ফড়িঙের নিম্ফ যা পানিতে থাকে তা পানিতে অবস্থিত মশার লার্ভা খেয়ে জীবন ধারণ করে, ফলে মশা নিয়ন্ত্রণে এই পতঙ্গটি অনেক সহায়তা করে, এ কারণে মশা দমনে বিশেষ করে ডেঙ্গু মশা দমনে ভারত, থাইল্যান্ড এবং মায়ানমারে ফড়িঙের ব্যবহৃত আশাব্যাঞ্জক। সৌন্দর্যের কারণে ফড়িং জাপানের শিল্পকলার একটি জনপ্রিয় বিষয়। এই প্রাণী বৈজ্ঞানিক গবেষণারও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অপরূপ সৌন্দর্যের কারণে প্রজাপতি ও পাখির মত ফড়িংও বিভিন্ন দেশে সংরক্ষণ হয়ে থাকে।

যে অঞ্চলে ফড়িং যত বেশি সেই অঞ্চলের পরিবেশ তত ভাল। দেশের কলকারখানার ক্ষতিকর বর্জ্য, ফসলের ক্ষেতে ব্যবহৃত অত্যধিক সার ও কীটনাশক ফড়িঙের জন্মস্থান-জলাশয়ের পানিকে দূষণ করছে। আর তাই দেশে সব অঞ্চলে ফড়িং কমছে প্রতিদিন। আর তাই প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ পতঙ্গ-ফড়িং রক্ষায় সচেতনতা তৈরি করতে হবে। সেইসাথে ফড়িঙের ডিম পাড়ার প্রাকৃতিক পরিবেশ বিশেষ করে লেক, পুকুর ও জলাশয়, ডোবা এগুলো যেন ভরাট না হয় এবং এর পানি যেন দূষিত না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। ফড়িঙের কোনো ক্ষতিকর দিক নেই, পূর্ণাঙ্গ ফড়িং এবং লার্ভা উভয়ই মানুষের জন্যে উপকারী। আর তাই এ বিষয়ে সচেতনতা আমাদের আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করবে।

লেখক: অধ্যাপক, প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।