প্রান্তিক মা-বাবার যাপিত জীবন

সুজানা মালিহা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ঃ

শেষ বিকেলটা গড়িয়ে তখন সন্ধ্যা নামবে প্রায়। পশ্চিম আকাশের লাল আভাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ করছিল। মাথার ভেতর মৌমাছির ঝাকের মত ভোঁ ভোঁ শব্দ। ভার্সিটির দুই নং গেট থেকে হলে ফিরছি। হলে হেটে আসতে প্রায় ত্রিশ মিনিটের পথ। সকাল থেকে একটা পাউরুটি ছাড়া পেটে কিছু পড়ে নি। তাই ভাবলাম কিছু নিয়ে যাই রান্না করার। বাজারে ঢুকলাম। পকেটের অবস্থা বেশি ভালো না, তাই এমন কিছু খুজছি যা দিয়ে যা দিয়ে পরপর দুইবেলা খেতে ভাল্লাগবে। লাল শাক এর দিকে চোখ গেল, প্রথম দেখলাম আটি বিশ টাকা। ভাবলাম একটু দেখে নেই কম পাই কিনা। লাল শাকের মালিক কিশোর ছেলে এর দাম চাইল পনের টাকা। নেওয়ার ব্যাপারে অনেকটাই যখন মনস্থির ঠিক সে সময়েই চোখ আটকে গেল বাজারের একদম কিনারার এক বৃদ্ধ এর দিকে। কাছে গিয়ে দেখি তার কাছে এক আটি লাল শাক মাত্র।আর কিছু নেই। শাকটাও তাজা মনে হল। দাম জানতে চাইলে বলল ‘দশ টাকা’। তার চিটাগং এর ভাষায়, ” লি যান না,মাত্র থুলছি ( নিয়ে যান, এই মাত্র শাক তুলে আনছি )”। আমার পকেট ও সায় দিল। আমি বললাম, ” একটা পলিথিন দিন, অনেক দূর হাঁটতে হবে তো “। লোকটা আশে পাশে তাকিয়ে জানাল, তার কাছে কোনো পলিথিন নেই। লোকটা বলছে আর উঠে যাচ্ছে। এমন ভাব যেন তার অনেক দেরি হচ্ছে। দশ টাকা হাতে পেয়ে অনেকটা দৌড়ের ভঙ্গিতে স্থান ত্যাগ করছে! তার ব্যস্ততা আমার নজর কারল, দেখলাম, একটু সামনে গিয়ে একটা হোটেলে ঢুকছে। আগ্রহ হল লোকটাকে জানার। বয়সটা আমার বাবার মতই। একটু পরেই দেখি উনি দুইটা রুটি নিয়ে দোকান থেকে বের হচ্ছে। পত্রিকায় পেছানো দুইটা রুটির একটা বের করে হাটছে আর খাচ্ছে। আমি অনেকটা দ্রুত গতিতে পা ফেলে তার খানিকটা কাছাকাছি চলে এসেছি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, চাচা… থাকেন কই?  “এক নম্বর গেট, বাবা “। দুই নম্বর গেট থেকে প্রায় প্রায় এক ঘন্টার পথ। তখনও ভাবছি ব্যাপারটা হতেই পারে। কিন্তু এর পরের আলাপচারিতা আমাকে স্তব্ধ করে দিচ্ছিল। তিনি হাটছেন আর বলছেন, “আপনারে পলিথিন দিতে পারলাম না, বাড়ি থেইকাই লিয়ে আসছি (নিয়ে আসছি) শাকটা । ভাবছি দশ টা টাকা হইলে গিন্নীর জন্য খাওয়ার কিছু নিতে পারব। রোটি ডালি যাইতেছি এইজন্য”। আমার আরো আগ্রহ হল তাকে জানার।হয়ত এর একটা কারণ হতে পারে বয়সের দিক বিবেচনায় সে আমার বাবার বয়সী। আমার আবার জিজ্ঞাসা, চাচার ছেলে মেয়ে কত জন?
“মেয়ে নাই কো বাবা, পুলা আছে। ”
আপনার ছেলে কোথায়!!
“আছে তো, হ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, অর্থনীতি তে। ” আমি রাগী ভাব নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, সে বাড়িতে আসে না?
” আসে তো, ঈদে, কুরবানিতে আসে, বাপজান মেলা কষ্ট করে, মাইনষের পোলাপান পড়ায়, আবার নিজে পড়ে। আমি তো দিতে পারি না কিছু মা ” আমার বাপের কিন্তু রেজাল্ট ভালো। ফাস্ট ক্যালাস পায় হ্যায় “। লোকটার চোখের পানি গোধুলির লাল আভায় স্পস্ট দেখা যাচ্ছে।

ছেলে কি জানে আপানারা যে রুটি খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন?
“” কি যে কন মা! এইসব কি কওয়া যায়! তার ফরম ফিলাপের টাকাডা এই মাসে দিছিলাম দেইখা একটু বেশি কষ্ট। হ্যাগোরে ক্যালাস থেইকা ঘুরতে নিয়া গেছিলো তো, হ্যার টাকা শ্যাস হই গেছিলো সেইখানে। বাপজানে আমার টাকা নিতে চায় না আমার থেইকা কখনো। হ্যায় উলটা দেয় আমগো। এই মাসটা একটু কষ্ট করি আরকি। “”

ভাত যে খাবেন না, চাচীর কষ্ট হবে না রাতে? লোকটা মৃদু হাসছে। “কাইল ভোরে খাইছিল, মা। ” ভেতর টা নড়ে উঠল আমার।
জিরো পয়েন্ট চলে এসেছি, চাচা এক নম্বর গেটের দিকে যাবে। আমি কাটাপাহাড়ের দিকে। ইচ্ছা হয়েছিল ওনাকে নিয়ে ভাত খাওয়াই। আমার জীর্ন মানিব্যাগ টা তখন কটাক্ষ করে বলল, হলে যাও।

চাচার সাথে এই আলাপচারিতা হয়েছিল যখন পরীক্ষা শেষে টিউশনে যেতে হয়েছিল বলে নিজের ভাগ্যকে দোষ দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হয়ে হাটছিলাম । চাচা চলে যাওয়ার পরে জিরো পয়েন্ট থেকে হল পর্যন্ত আসতে দেখলাম আর কষ্ট হচ্ছে না।