পহেলা বৈশাখ; বাঙ্গালির প্রাণের উৎসব

মুনির আহমদ
পহেলা বৈশাখ, বাংলা সনের প্রথম দিন। বাঙ্গালির সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসবের দিন। নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা, নতুন প্রেরণা ও নতুন সাধনায় উদ্দীপ্ত হওয়ার দিন। নতুন বছরে পদার্পণের এই দিনে সারাদেশ বৈশাখী উৎসবে মাতোয়ারা থাকে। বাঙ্গালি ষোলআনা সাজে তার চিরচেনা রঙে, ঢঙে, রুপে ও বৈচিত্রে। নিজেদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অবয়বে। পোষাক-পরিচ্ছদ, খাওয়া-দাওয়া, গানবাদ্য ও নৃত্যগীত সব কিছুতেই থাকে বাঙ্গালিয়ানার প্রাধান্য। হীনমন্যতা ও সংকীর্নতার উর্ধ্বে উঠে প্রতিটি বাঙ্গালি প্রাণের এই উৎসব পালন করে হৃদয়ের গভীর থেকে। আনন্দ উল্লাসের সাথে। বর্ণিল ও বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্যদিয়ে তারা দিনটি অতিবাহিত করে। উদ্বুদ্ধ হয় বৃহত্তর জীবনবোধ ও সমষ্টি চেতনায়। এই দিনে বাঙ্গালি ফিরে পায় রঙে রঙে রঙীন হওয়ার তুলনাহীন এক অনুভূতি যা সুরের ঝংকারের মত, ছন্দের উত্তেজনার মত, শিল্পীর শৈল্পিক হাতের ছোঁয়ায় ক্যানভাসে ফুটে ওঠা দৃষ্টি নন্দন ও স্বপ্নময় অপরূপ তৈলচিত্রের সৌন্দর্য্যরে মত। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এবং পশ্চিমবঙ্গে চান্দ্রসৌর বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১৪ অথবা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় পার্বণ হিসেবে পহেলা বৈশাখ অন্তর্ভূক্ত হয় ১৯৭২ সালে।
পহেলা বৈশাখের উৎসব বাঙ্গালি সংস্কৃতির নিজস্ব সম্পদ। চিরন্তন এই মহোৎসব উদযাপিত হয় জাতীয়ভাবে। বছরের পর বছর জুড়ে, ঘুরে ফিরে বৈশাখ বার বার আসে, বাঙ্গালির প্রতিটি আঙ্গিনায় প্রাণের উচ্ছ্বাস নিয়ে। আবির্ভূত হয় নতুন স্বপ্ন ও নতুন প্রত্যাশা নিয়ে। মনের কালিমা ও চিত্তের দৈন্যতা থেকে মুক্তির প্রেরণা নিয়ে। অনিন্দ্য সুন্দর রূপ বৈচিত্র নিয়ে। বিগত বছরের দুঃখ-বেদনা, হতাশা, ব্যর্থতা, নৈরাজ্য আর ক্লান্তির সব হিসাব চুকে আগামীর দিকে সম্ভাবনার পথে এগিয়ে যাওয়ার এক প্রবল ইচ্ছা শক্তি নিয়ে। গ্রামে-গঞ্জে, হাট-বাজারে, শহর-বন্দরে ইটপাথরের কোলাহলে, রমনার বটমূলে, চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রা আর ব্যবসায়ীর হালখাতায়, মুন্সিগঞ্জের বিখ্যাত সেই ষাঁড়ের লড়াই কিংবা চট্রগ্রামে জব্বারের বলিখেলার ময়দানে, পাহাড়ীদের বিজু উৎসবে সাদা শাড়ী লাল পাড়ে, রঙ-বেরঙের সাজ পোষাকে, গ্রামীন সংস্কৃতির বিভিন্ন অভিব্যক্তি তথা নৃত্যগীতের সাথে পান্তা ইলিশ ও ঐতিহ্যবাহী বাঙ্গালী খাবারের সমারোহ নিয়ে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ মেতে ওঠে চিরায়ত এই উৎসবের দিনে। বাঙ্গালিয়ানার এই দিনে স্পন্দিত হয় পুরো দেশ, পুরো জাতি। যা সুবিস্তৃত হয় শহরের ইট-কাঠ থেকে গ্রামের মেঠো পথ পর্যন্ত। এই দিনে বিভিন্ন ধর্মের, বিভিন্ন বর্ণের, বিভিন্ন বয়সের মানুষ এক পঙক্তিতে দাঁড়িয়ে একাত্মতা অনুভব করে। ভুলে যায় বিভেদ, হিংসা, বিদ্বেষ। সব সন্দেহ ও অবিশ্বাসের গ্লানি মুছে অগ্নি স্মানে শুচি হয় ধরা। সব সংকীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠে, সব সংস্কারের জাল চিহ্ন করে, সবাইকে এক সূত্রে গ্রথিত করে পহেলা বৈশাখ সবাইকে কাছে টেনে নেয়। ঠেলে দেয় পারস্পরিক সহ-অবস্থানে। সমাজব্যাপী সৃষ্টি করে ঐক্যানুভূতি ও প্রীতিময়তার বন্ধন। বাঙ্গালি জাতিসত্তার জীবন বৈচিত্রের বহুমুখী ধারাকে সমবেত করে মহামিলনের বিস্তীর্ণ মোহনায়। আবদ্ধ করে সমষ্টি চেতনায়। এভাবেই পহেলা বৈশাখ জাতীয় জীবনের প্রতিটি বাঁকে রূপান্তরিত হয়েছে মিলনতিথি রূপে।
বাংলা বর্ষের জন্ম হয়েছিল মুঘল স¤্রাট আকবরের আমলে। খাজনা আদয়ের সুষ্ঠুতা প্রণয়নের লক্ষ্যে তিনি বাংলা সনের প্রবর্তণ করেন। তাঁর নির্দেশে রাজদরবারের জ্যোতিষী ও বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ফতেউল্লাহ সিরাজী সৌরসাল ও চন্দ্রসালের মধ্যে সমন্বয় করে বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। সেই থেকে বাংলা সন হয়ে যায় বাঙ্গালির। জীবনঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে বাঙ্গালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষ্টি ও সংস্কৃতির সাথে। বাংলা বারো মাস ঘিরে আবর্তিত হতে শুরু করে ঋতু বৈচিত্র্যের সব লীলা খেলা। গ্রামীন জীবনে ফিরে আসে সজীবতা। বাংলা সনের গণনা শুরু হয় হিজরী ৯৯৩ সনের ৮ রবিউল আওয়াল বা ১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দের ১০ মার্চ থেকে। গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসনে আরোহণের সময় হিজরী ৯৬৩ সন বা ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। সেই সময় ৯৬৩ চন্দ্র সনকে ৯৬৩ বাংলা সৌর সনে রূপান্তরের মধ্যদিয়ে বাংলা বর্ষপঞ্জির যাত্রা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ফসলি সন নামে পরিচিতি পেলেও পরে এই সন ‘বঙ্গাব্দ’ বা বাংলা বর্ষ নামেই সুপরিচিত হয়ে ওঠে।
আকবরের শাসনামলে বাংলা চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে প্রজাদের সকল প্রকার খাজনা, শুল্ক ও মাশুল পরিশোধ করতে হতো। পরের দিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূ-স্বামীগণ নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদেরকে মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে তখন মেলাসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হতো। উৎসবটি পরিণত হতো সামাজিক অনুষ্ঠানে। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণের মানুষের উপস্থিতি পরস্পরের মধ্যে তৈরী করতো সম্প্রীতির এক মেলবন্ধন। তখনকার সময় বাংলা বর্ষের প্রথম দিনের অন্যতম আকর্ষন ছিল হালখাতা। যার অর্থ নতুন হিসাব বই খোলা। ব্যবসায়ী ও দোকানীরা যার যার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বা দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া হিসেবে পুরাতন বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন বছরের জন্য হিসাব বই চালু করতো। বর্তমান ডিজিটাল যুগে ডিজিটাল পদ্ধতিতে ব্যবসা বানিজ্যের হিসাব নিকাশ সংরক্ষণ করা হলেও গ্রাম বাংলার দোকানীরা বিশেষত স্বর্ণের দোকানীরা এখনও পুরাতন বছরের হিসাব হালনাগাদ করে হালখাতার মাধ্যমে। প্রথাগত নিয়মানুযায়ী দোকানীরা এখনও হালখাতার দিনে ক্রেতাদের মিষ্টান্ন দিয়ে আপ্যায়ন করে থাকে।
প্রথম আধুনিক নববর্ষ উদযাপন করা হয় ১৯১৭ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৮ সালেও অনুরূপভাবে বর্ষবরণের প্রমাণ মিলে।
বর্তমান আমেজে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ধারণাটি এসেছে মূলত: এক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। তৎকালীন আইয়ুব সরকারের আমলে পাকিস্তানে রবীন্দ্র সংগীত চর্চা নিষিদ্ধ করা হয়। বাঙ্গালি সংস্কৃতি চর্চা বিরোধীতার প্রতিবাদ স্বরূপ ছায়ানটের সাংস্কৃতিক কর্মীরা ১৯৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল ঢাকায় রমনার বটমূলে, কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’ গানটি দিয়ে সর্বপ্রথম শহুরে আদলে বাংলা নববর্ষ বরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করে। তারা নিজস্ব সংস্কৃতির অপরূপ ভঙ্গিমা তুলে ধরে গানে গানে মুখরিত কন্ঠে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অগণতান্ত্রিক শাসন, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন ও শোষনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা শানিত করে। সেই থেকে রমনার বটমূল হয়ে ওঠে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রাণ কেন্দ্র রূপে। তাকে ঘিরে সূচীত হয়ে আসছে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের সব আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই রমনার বটমূল ধর্মীয় পরিচয়ের সামান্যতম প্রতিবন্ধকতা সরিয়ে স্বজাতির সবাইকে একসূত্রে গেঁথে জড়ো করে নিয়েছে তার সুশীতল ছায়াতলে, পরম প্রশান্তি ভরা স্বস্তিতে।
পহেলা বৈশাখের উৎসব অনুষ্ঠানে নান্দনিকতা যুক্ত করে মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইন্সস্টিটিটিউটের উদ্যোগ ও নেতৃত্বেই গড়ে ওঠে এই শোভাযাত্রার যতসব আনুষ্ঠানিকতা। চারুকলার শিল্পীদের তৈরী করা বিভিন্ন ধরনের প্রতীকী শিল্প কর্ম নিয়ে নববর্ষের দিনে নানা ধর্ম ও বর্ণের হাজার হাজার মানুষ এই শোভাযাত্রায় অংশ নিয়ে থাকে। ঢাক আর অসংখ্য মুখোশ খচিত প্ল্যাকার্ডসহ মিছিলটি নাচে গানে উৎফুল্ল পরিবেশ সৃষ্টি করে। ১৯৮৯ সালে তৎকালীন স্বৈর-শাসনের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ঐক্য এবং একই সঙ্গে শান্তির বিজয় ও অপশক্তির ধ্বংস কামনা নিয়ে এই শোভাযাত্রার আত্মপ্রকাশ ঘটে। চারুকলার শিল্পীদের নেয়া এই ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগটি বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে নতুন মাত্রা যুক্ত করে। প্রথম দিকে এই শোভাযাত্রার নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ থাকলেও পরবর্তীতে ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে সুপরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি বর্ষবরণ উদযাপনের যেমন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ তেমনি ইউনেস্কোর সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও অংশ। ২০১৬ সালে ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে ‘মানবতার অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য’ হিসেবে ঘোষণা করে। এই শোভাযাত্রার বিশেষত্ব হলো, তা মানুষের মধ্যে ঐক্যের বন্ধন প্রতিষ্ঠায় যেমন সহায়ক তেমনি যুক্ত করে আনন্দ উচ্ছ্বাসে মেতে ওঠার ভিন্ন এক আহ্বান। শান্তির বিজয় ও অপশাসনের ধ্বংস এবং মানবতার কল্যাণ ও মুক্তি নিয়ে সে আবির্ভূত হয় ধরায়। কোন কোন সংগঠন একে বাংলা শোভাযাত্রা নামেও উদযাপন করে থাকে।
নব্বই দশকে বর্ষবরণ উদযাপনে যুক্ত হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার উৎসব আয়োজন ও শোভাযাত্রায় ব্যবহৃত শিল্প কর্মগুলো নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের ভিন্নধর্মী বক্তব্য রয়েছে। তাদের মতে, বর্ষবরণে যুক্ত হওয়া নতুন এই রেওয়াজগুলো মুসলমানের মূল স্প্রিটের সঙ্গে বেমানান। তাদের যুক্তি, এই রেওয়াজগুলো বাঙ্গালী হিন্দু সমাজের ধর্মীয় অনুভূতি, আচার অনুষ্ঠান, তাদের সংস্কৃতি এবং পূজা, পার্বণ ও নানাবিধ উৎসবের সাথে সামঞ্জ্যপূর্ণ। বর্ষবরণের উৎসব নিয়ে যারা যে দৃষ্টিতেই সমালোচনা করুক না কেন এ কথাতো ঠিক যে, বাঙ্গালির এই আয়োজনে নেই কোন ধর্মের দেয়াল, নেই কোন সংস্কার। আছে কাছে আসার, কাছে টানার বাঙ্গালিয়ানা। আছে এক অনাবিল আনন্দে অবগাহনের আহ্বান। অর্থাৎ এই উৎসব কোন একক ধর্মীয় জাতি গোষ্ঠীর নয়। বরং বাংলা ভাষা-ভাষি সব জাতি গোষ্ঠীর, সব সম্প্রদায়ের, সব শ্রেণী পেশার ও ভিন্ন ভিন্ন বয়সের সব মানুষের। তাই যুগের পর যুগ পেরিয়ে এই উৎসব আয়োজন ধারণ করে আসছে অসাম্প্রদায়িক চেতনা। রূপ নিয়েছে সার্বজনীন উৎসবে। এই দিনে বাঙ্গালি আপনা থেকেই আত্মপরিচয় খুঁজে পায়। ফিরে পায় তার শিকড়ের ঠিকানা। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র নির্বিশেষে সব চেতনার মানুষ আত্মীয়তার বন্ধন অনুভব করে। উপনীত হয় মহামিলনের বিস্তীর্ণ মোহনায়, ঐক্যের আঙ্গিনায়। সার্বজনীনতার বদৌলতে এই উৎসব অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে মহা আনন্দের ও পরমতৃপ্তি ভরা প্রশান্তির।
বাংলা নববর্ষের উৎসব আছে বলেই বাঙ্গালির পরাজয় নেই। নেই দুর্যোগ, শঙ্কা ও উৎকন্ঠায় ভয় পাওয়ার আশঙ্কা। এই উৎসব জাগরণের ঘন্টাধ্বনি বাজায়। জাগায় শোষন ও বঞ্চনার শৃঙ্খল ভাঙ্গার প্রেরণা, উৎসাহ উদ্দীপনা। অন্নদাশঙ্কর যথার্থই বলেছেন, সার্থক সংস্কৃতির ডাইমেনশন তিনটি। তিনি বলেন, ‘দেশকে স্বাধীন করাই যথেষ্ট নয়। দেশের মানুষকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, সৃষ্টি করতে, নির্মাণ করতে শেখাতে হবে। পশ্চিমের সঙ্গে, আধুনিকের সঙ্গে পা মিলিয়ে নিতে হবে। পশ্চাতের সঙ্গে, ঐতিহ্যের সঙ্গে সমন্বয় রক্ষা করতে হবে। জনগণের সঙ্গে, লোক সংস্কৃতির সঙ্গে যোগসূত্র অবিচ্ছিন্ন রাখতে হবে।’’ পহেলা বৈশাখ সংস্কৃতির এই তিনটি ডাইমেনশন বাঙ্গালির মর্মমূলে প্রবেশ করিয়ে দিয়েছে। সংস্কৃতির এই শক্ত বাঁধনটুকু আছে বলেই কোন আপশক্তি বা দুঃশাসন বাঙ্গালিদের উপড়ে ফেলতে পারেনি। পারেনি তাদের বিভ্রান্ত ও পথভ্রষ্ট করতে। নিজস্ব সংস্কৃতির শিকড় থেকে বিচ্যুত করতে। যেমন পারেনি তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। দন্ত নখর বিস্তৃত করেও তারা বাঙ্গালির ঐক্যে এবং স্বজাত্যবোধের চেতনায় ফাটল ধরাতে পারেনি। বিচ্যুত করতে পারেনি তাদের স্বাধীনতা অর্জনের অভীষ্ট লক্ষ্য থেকে। পহেলা বৈশাখের এই অপরাজেয় আহ্বান আজও অব্যাহত আছে। নব্বই দশকে স্বৈরাচার হটিয়ে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় পহেলা বৈশাখের উৎসব আয়োজন যেমন স্মরণীয় ভূমিকা রেখেছে তেমনি আজকের দিনে জঙ্গিবাদ, উগ্রবাদ, ধর্মান্ধতা ও সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে যুগিয়েছে দিশা। শানিত করছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সেই জন্য বলা হয়, একদিন যে পহেলা বৈশাখ সীমাবদ্ধ ছিল মূলত: ব্যবসায়ীদের হালখাতার মধ্যে, তা-ই ষাটের দশক থেকে জাতিপরিচয়ের পুনরাবিষ্কার ও স্বাধীনতা-অভিসারী জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের গতিধারায় নতুন মাত্রা যুক্ত করে এখন স্ফুরিত আপন আচার ও সংস্কৃতির বর্ণিল প্রকাশে।
পহেলা বৈশাখের সার্বজনীন আহ্বান থাকে ‘মুছে যাক সব গ্লানি, ঘুছে যাক সব ঝরাজীর্ণতা। দূর হোক সব জঞ্জাল, মনের কালিমা ও চিত্তের দৈন্যতা।’ কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর তার নববর্ষ প্রবন্ধে সেই আভাস দিয়ে লিখেছেন, ‘এই মহিমান্বিত জগতের অদ্যকার নববর্ষ দিন আমাদের জীবনের মধ্যে যে গৌরব বহন করিয়া আনিল। এই পৃথিবীতে বাস করিবার গৌরব, আলোকে বিচরণ করিবার গৌরব, এই আকাশ তলে আসীন হইবার গৌরব, তাহা যদি পরিপূর্ণভাবে চিত্তের মধ্যে গ্রহণ করি, তবে আর বিষাদ নাই, নৈরাশ্য নাই, ভয় নাই, মৃত্যু নাই।’ এই আহ্বান চিরন্তন ও অবিকৃত থাকুক। অটুট থাকুক পহেলা বৈশাখের সার্বজনীন ও অসাম্প্রদায়িক ভাবধারা। এই উৎসব হোক জাতীয় ঐক্যের প্রতীকস্বরূপ এক আনন্দঘন মহোৎসব। জাতীয় জীবনে সুষম শান্তির এক মহান অভিভ্যক্তি। দূর হোক জাতীয় পর্যায়ের সব অনৈক্য, সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, সব বিভাজন। বাংলাদেশ হোক শান্তির এক মহা নীড়। অব্যাহত থাকুক তার উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির ধারা। আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে বিরাজ করুক সত্য ও সুন্দর। জয় হোক মানবতার, অসাম্প্রদায়িক চেতনার।

লেখকঃ সহযোগী অধ্যাপক, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ ইউডা।