পরী

-পলাশ প্রসন্ন সেন
কার্তিকের সন্ধ্যা, শুক্লপক্ষের পূর্ণচাঁদ। ভাঙ্গা পিচ ঢালা পথধরে কিছু দূর হেঁটে  নবান্ন কোন এক টিনের ঘরের  জানালার খানিক দূরে দাঁড়ালো। বিদ্যুৎ ছিল না, অন্ধকার ঘরে প্রদীপের আলোয় পড়ার  টেবিলে বসা স্থির কোন এক শ্যামা মুখ, কোন দিকে মনোযোগ নেই। নবান্ন খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে চলে গেল। এ পথে তার নিয়মিত যাতায়াত, জীবনের টান  কোনদিন বন্ধ না হলে এ পথে তার যাত্রা বন্ধ হবে  বলে মনে হয় না। জীবন তাকে ঐ টিনের ঘরের  জানালা  দিয়ে ইশারায় ডাকে। সে ইশারার ভাষা অনেকের কাছে অজ্ঞাত হলেও নবান্ন এ ভাষা পাঠোদ্ধার করতে পারতো। অতঃপর কোন এক বিকেলে নবান্ন যে ছাত্রাবাসে থাকে সেখানকার পুকুর পাড়ে বসে অমিতাভ ও শেখরের সঙ্গে কথায় কথায় ছাত্রাবাসের অদূরের ভাঙ্গাপথের ধারে সেই টিনের ঘরের জানালার পাশে বসা এক পরীর গল্প করেছিলো। গল্পের ভাষাখানি শ্রীকৃষ্ণকীর্তনের ভাষা না হলেও পদাবলীর ভাষা হবে হয়তো । তারপর বেশ কিছুদিন নবান্নের আর দেখা নেই। কিছুদিন বাদে হঠাৎ শেষ অঘ্রাণের এক সন্ধ্যা বেলায় উলের চাদর গায়ে জড়িয়ে নবান্ন অমিতাভের রুমে এসে দেখলো অমিতাভ সিল্কের  পাঞ্জাবীতে কাশ্মীরিশাল জড়িয়ে  গায়ে সুগন্ধি দিচ্ছে। নবান্ন বললো বেশ খুশিতেই আছিস দেখা যায়! কোথায় যাবি ?
অমিতাভ মুখচেপে হেসে বললো , একটা অনুষ্ঠান আছে, প্রিয় মানুষের সাথে দেখাও হবে সেই সাথে !
-কার সাথে?
এখনো বলার সময় হয়নি বন্ধু, সময় হলে সব জানাবো।
সময় হলে নবান্ন কি জানবে? অনাগত জীবনের কোন সত্য তার জন্য অপেক্ষমান ? সত্য লুকায়িত  থাকলে মিথ্যার বোঝা ভারী হয়। হয়তো সে বোঝা একদিন নবান্ন বইতে পারবে কিনা প্রশ্ন থেকে যায় !!
আসছি বন্ধু, রাতে কথা হবে এই বলে অমিতাভ বেরুনোর প্রস্তুতি নিলো।
রাতে কখন ফিরবি? নবান্ন জিজ্ঞেস করলো
রাতে এক সাথে খেতে যাব- এখন আসি এই বলে অমিতাভ বেড়িয়ে গেলো।
নবান্ন মনে হয় কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলো না। তার কি কিছু বলার ছিলো! যে কথা বলার সময় অমিতাভ দিলো না! নবান্নদের বুঝি এমনই হয়, কতো কাল কতো জনের সামনে মুখের কথা বুকে ফিয়ে নিতে হয়েছে তা নবান্ন ছাড়া আর কে ভালো জানে!! অমিতাভ দ্রুতপদে চলে গেলো  নবান্ন তাকিয়ে রইলো অমিতাভের সেই চলে যাবার পথ ধরে।
তখন রাত্রি নেমেছে, খাবার শেষে ছাত্রাবাসের অদূরে মহল্লার মোড়ে বেঞ্চে বসে কথা বলছে অমিতাভ ও শেখর, নবান্নেরও একসাথেই খাবার কথা ছিলো কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে সে আসে নি !! অথচ প্রায় দিনই খাবার পরে তারা একসাথেই আড্ডা দেয়। আজ নবান্ন আসে নি তাই দুজনেই বেশ কথা বলছে, কথায় কথায় কি কথা নিয়ে যেন দুজনে হেসে উঠলো একবার। এমন সময় নবান্ন সেখানে হাজির ! অস্পষ্ট আলোয় দাঁড়িয়ে বললো,নবান্ন হেসে বললো বন্ধু আমার জায়গা তোরা দখল করতে আসছিস?
কোন জায়গা? – অমিতাভ কিছু বুঝে উঠতে পারলো না!
-এই দিক আয় বসে কথা বলি!!
নবান্ন বললো, আরে কিছু না, এমনি মজা করলাম। আমি এখানে রোজ বসি তো তাই আর কি! তোরা আড্ডা দে, আমি রুমে যাই, কাল পরীক্ষা আছে- নবান্ন এই বলে এক পা সামনে বাড়ালো।
অমিতাভ বললো পরীক্ষা হলে আর কি বলবো! ঠিক আছে যা তবে।
তারপর নবান্ন কিছুদিন আসে নি। শেখর কিংবা অমিতাভের রুমে। চলার পথে দেখা হলে কিংবা ফোন করে কাছে ডাকলে পরীক্ষা কিংবা অন্য কোন কারণ দেখিয়ে এড়িয়ে গেছে বার বার। সময় চলছিলো এভাবেই।
তখন শীতের শেষ, সেদিন কেবল সন্ধ্যা গড়িয়েছে। অমিতাভ তার প্রিয় সাইকেল খানা নিয়ে টিউশনের উদ্দেশ্যে বেরুবে এমন সময় শেখরের ফোন! ফোনে হ্যালো বলতেই, শেখর বললো নবান্নের রুমে আয় একটু।
শেখর বললো কেন? জরুরী কিছু?
আমি তো একটু বেরুব
– সে পরে বেরুস আগে এই দিক আয় জরুরী।
অমিতাভ যখন নবান্নের রুমের দরজায়  উপস্থিত তখন দেখলো  রুমের ভেতর নবান্ন, শেখর সহ আরো দুজন বসা। অমিতাভ রুমের ভেতর প্রবেশ করে শেখরকে জিজ্ঞেস করলো কিরে কি হয়েছে!
নবান্ন এ কথা শুনে বেশ খেপে উঠলো, তোরা কি শুরু করেছিস?
অমিতাভ শেখরের মুখের দিক তাকালো।  কি শুরু করলাম ?
– তোরা এর ওর কাছে এগুলো কি বলে বেড়াস!
কি বলে বেড়াই? খোলাখুলি বল!
অমিতাভ রুমে অবস্থাকৃত একজন কে জিজ্ঞেস করলো কি হয়েছে নবান্নের? সে বললো ছাত্রাবাসের সবাইকে আপনারা নাকি কি কি বলে বেড়াচ্ছেন!
অমিতাভ নবান্নের মুখের দিকে তাকালো।
নবান্ন বললো তোরা কিছু বলিস নি?
কি বলবো?
– তবে ছেলে পেলে আমায় দেখে হাসে কেন?
আমায় দেখলে কানাকানি করে কেন?
তোরা ছাড়া আর কে জানে এ কথা!
অমিতাভ জিজ্ঞেস করলো কোন কথা?
আমার আর বরুনার কথা!
-কোন বরুনা?
কলনিতে থাকে, তোদের অনেক দিন আগে বলেছিলাম।
অমিতাভ এই কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠলো।
কবে কার কোন কথা! আমাদের তো ঠিক মতো কিছু বলিসও নি!
আর কাকেই বা কি বলবো?  এ ব্যাপারে আমরা কি তেমন কিছু জানি?
নবান্ন ঠিক ভাবতেই পারে না, এরা কিছু জানে না! নিজের ভেতর এতদিনের পোষা ভাবনাগুলো কি এত সহজেই অবাধ্য হয়!
তবে তোরা ঐ দিন রাতে বেঞ্চে বসে বরুনাকে দেখে আমায় নিয়ে হাসছিলি!!
-কোন বেঞ্চে?
কলনির পাশে!
-আর তোকে দেখেই হাসবো কেন! এমনি কি কথা নিয়ে যেন হাসছিলাম।
অমিতাভ আবার বললো দেখ নবান্ন, সেদিন খাওয়া দাওয়া শেষ করে এমনি বসেছিলাম, তোর কোথায় কে বা কি আছে সে ভাবনা আমাদের মাথায় ছিলো না!
– পেছনেই বরুনার বাসা  আর ও তখনো জানালায় বসা ছিলো।
অমিতাভ বললো এখন জানলাম।
অমিতাভ একটা কথা বলবি?
-বল
তুই কি বরুণকে পছন্দ করিস?
– মানে??? অমিতাভের চোয়াল শক্তহয়ে এলো, বললো,  দেখ নবান্ন আমি তো বরুনা কে চিনিই না আর পছন্দ আসে কোথা থেকে !
তুই সেদিন পাঞ্জাবি পড়ে ওর সাথে দেখা করতে যাস নি?
কোন দিন?
যে দিন তোর রুমে গেলাম।
-সেদিন আমার বিভাগে নবীন বরণ ছিলো।
নবান্ন যেন কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না! অবিশ্বাস একবার মনে গেঁথে গেলে বিশ্বাসের পরশ পাথরের ছোঁয়ায়ও তা অবিশ্বাসই থেকে যায়। অবিশ্বাস যুক্তি বুদ্ধি বিচার করে না! অবিশ্বাস শুধুই অবিশ্বাস!!! এর থেকে বড় সত্য হয় না!
নবান্ন কি ভেবে চুপ হয়ে রইলো। তার চোখ গড়িয়ে জল চলে এলো।
অমিতাভ নবান্নের চোখের জল নিজ হাতে মুছিয়ে দিয়ে বুকে চেপে ধরে বললো বন্ধু মনে মনে এতো ভুল জমিয়ে রেখেছিস?
বন্ধুত্বের প্রতি এতো অবিশ্বাস??
নবান্ন আর কিছু বলতে পারলো না।
অমিতাভ নবান্নর হাত চেপে ধরে বললো, নারে বন্ধু তেমন কিছুই না! এমন কিছু আর ভাবিস না! যা আমি বিয়ে করলে প্রথম নিমন্ত্রণ তোকেই দেব, কথা দিলাম। তুই তোর বরুনাকে নিয়ে আসবি। আর কোন ভুল ধরে বসে থাকিস না!
নবান্ন আর কিছু বললো না, শুধু একটু হাসলো।
তার পর অনেক দিন পার হয়ে গেছে, অমিতাভ কিংবা শেখরের সাথে নবান্নের দেখা হয় নি! খোঁজ নিয়ে জেনেছে নবান্ন ছাত্রাবাস ছেড়ে দিয়েছে!
নবান্ন চলে গেলো!!!
দেখাও করে গেলো না!!
একবার বলতেও তো পারতো।
তারপর অনের দিন কেটে গেলো, অমিতাভ, নবান্ন কিংবা শেখর কেহই আর এখন ছাত্রাবাসে থাকে না, জীবিকার টানে যে যার মতো ব্যস্ত।
বছর দু’য়েক হলো অমিতাভের চাকুরী হয়েছে। বাড়ি থেকে বিয়ের জন্য মেয়ে ঠিক করেছে ক’দিন আগে। কোন একদিন বন্ধু নবান্নকে কথা দিয়েছিল বিয়ের প্রথম নিমন্ত্রণপত্র তাকে দেবে,সে ভুলে নি, আজ তার সে কথা রাখবার পালা – কথা দিলে যে কথা রাখতে হয়!  অনেক কষ্টে নবান্নের বাড়ির ঠিকানা যোগার করে সে’বার এক জৈষ্ঠের রৌদ্র ঝরা দুপুরে নবান্নের উঠানে উপস্থিত।
দরজায় গিয়ে নবান্ন আছে কি জিজ্ঞেস করতেই এক মাঝ বয়সী ভদ্রমহিলা ঘরের ভেতর থেকে জিজ্ঞেস করলো কে বাবা?
-আপনি?
হ্যাঁ আমি নবান্নের মা
আমি নবান্নের বন্ধু অমিতাভ, কাকিমা। আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়তাম।অমিতাভ!!!!
তোমাদের কথা তখন শুনতাম বাবা, ঘরে এসো। অমিতাম কে ঘরে গিয়ে বসলো।
-কাকিমা নবান্ন কোথায়?
ও আছে পুকুর ঘাটের ঐ দিক, একটু জিড়িয়ে না হয় ওর সাথে দেখা করো!
অমিতাভ বললো কাকিমা অনেক দিন দেখা নেই ওর সাথে, দেখা করেই না হয় বিশ্রাম নেব চলুন একটু কষ্ট করে এই বলে সে উঠে দাঁড়ালো। দুজনে খানিক দূর হেঁটে  পুকুর ঘাটের দিক গেলো, অমিতাভ  দেখলো ঘাটের পাশে একটা বাঁশের মাচায় সর্বাঙ্গে ধুলো মাখা একজন কঙ্কালসাড় মানুষ শুয়ে আছে।
নবান্নের মা আঁচলে চোখ মুছে বললো এই তোমার বন্ধু নবান্ন।
মাথা ন্যাড়া করা মুখে খোঁচা দাড়ি এক দেখায় চেনার উপায় নেই। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কতো স্মৃতি মুহুর্তে নাড়া দিয়ে গেলো। এ কাকে দেখছি!!! এই সেই নবান্ন যার সাথে সুখে দুখের অনেক গল্পই করতো , কতো স্মৃতি, হাসি ঠাট্টা কিংবা ঝগড়া !!! অমিতাভ চোখের জল মুছে জিজ্ঞেস করলো কি করে হলো এসব!!
ঠিক জানি না বাবা, অনেক ডাক্তার কবিরাজ দেখানো হয়েছে, কোন লাভ হয় নি। আজ ক’বছর ধরে তো এমনিই আছে, কিছুতেই কিছু হয় না!!! বলে সে আবার চোখ মুছলো।
অমিতাভ নবান্নের কাছে গিয়ে তার হাত চেপে ধরলো। নবান্ন কিছু বললো না, অমিতাভ বুঝে গেছে স্মৃতির সাথে সাথে বন্ধুত্বও হারিয়ে ফেলেছে নবান্ন। অমিতাভের চোখ বেয়ে টপ টপ করে জল পড়তে লাগলো। নবান্ন নির্বাক চোখে তাকিয়ে রইলো চোখের জল মুছে দিলো না কিংবা বললো না ছেলে মানুষের চোখের জল ফেলতে নেই বন্ধু। শুধুই ভাষাহীন চোখে অমিতাভের মুখে তাকিয়ে রইলো। সে তাকানোতে কোন অনুভূতি নেই, নেই বন্ধুত্বের টান – সেদিনের মতো অভিযোগ কিংবা অভিমান। অমিতাভ নবান্নের মুখে তাকিয়ে রইলো, বন্ধুত্ব বোধহয় এমনই হয়। নির্বাক চোখেও ভাষা খোঁজে।
আমিতাভ এভাবে থাকতে পারছিলো না, সে বললো মাসি মা চলুন। নবান্নের মা বললো চলো বাবা! নবান্ন বাঁশের মাচায় যেমনি ছিলো তেমনি পড়ে রইলো। অমিতাভ যাবার সময় একবার পেছনে ফিরে তাকালো। নবান্নের নির্বাক চোখে চোখ পড়লো কিন্তু সে চোখে বন্ধুর প্রতি কোন আকুতি নেই, নেই সে টান যে টান থেকে বলবে আজ যাস না বন্ধু। অমিতাভের চোখ আবার ঘোলা হয়ে এলো। নবান্নের মা হাঁটতে হাঁটতে বলতে লাগলো,  আজকাল আর নবান্ন তেমন কথা বলে না সারাক্ষণ চুপচাপ থাকে। মাঝেমাঝে বলে একটা পরী নাকি ওকে কোথায় উড়িয়ে নিয়ে যায়, পরে আবার এখানে রেখে যায়। কোথায় নিয়ে যায় কে নিয়ে যায় আর কিছু বলে নি। অমিতাভ একটা গভীর নিঃশ্বাস চেপে গেলো। তার মনে পড়লো হ্যাঁ নবান্ন তাকেও একদিন এক পরীর গল্প বলেছিলো। যে রোজ সন্ধ্যায় ভাঙ্গা পিচ ঢালা পথের ধারে; এক টিনের ঘরের জানালা থেকে তাকে  ইশারায় ডাকতো। সেদিন নবান্ন নিজেকে চিনতো তাই পরী তাকে কাছে টানে নি, আজ সে নিজেকে ভুলে গেছে তাই হয়তো পরী তাকে কাছে টেনে নিয়েছে। হায় রে জীবন!!! জীবনটা বোধহয় এমনিই হয়।
শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়