এক গবেষণা ক্লাবের গল্প

মুতাসিম বিল্লাহ নাসিরঃ 

‘জার্নাল নিয়ে বিস্তারিত ধারণা ছিলোনা। কিভাবে পেপার লিখতে হয়, প্রত্যেকটা পর্যায়ে কি কাজ করতে হবে সে বিষয়ের প্রস্তুতি কি তা পুরোটাই ছিলো অজানা। কিন্তু সেই সমস্যাগুলো সমাধান করে দিয়েছে এই রিসার্চ ক্লাব।’ ইউডার ফার্মাসি রিসার্চ ক্লাব নিয়ে এমনটিই অভিমত ইউডার ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল মুয়িদ রাকিব এর।

৬ষ্ঠ সেমিস্টার এর শিক্ষার্থী মশিউর রহমান বাধন এর উপলদ্ধি হলো ‘এই ক্লাবের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার পর থেকে সিনিয়রদের সাথে সখ্যতা বেড়েছে। সপ্তাহে কোনো না কোনো সিনিয়র শিক্ষার্থী হাজির হোন, যারা দেশ সেরা বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে কাজ করছেন, তাদের চাকুরি জীবনের অভিজ্ঞতা নিয়ে।’ আর এই ক্লাবের বাড়তি সুবিধা এনে দিচ্ছে পরস্পরের চিন্তা করার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান ও একে অপরের সঙ্গে আইডিয়া বিনিময়ের বিষয়টি। পাশ থেকে ফার্মাসি বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী গোলাম কিবরিয়া জানায়, তার স্বপ্ন ছিলো দেশের বাইরে উচ্চশিক্ষা নেওয়ার। কিন্তু কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে সে বিষয়ে কোনো ধারণা ছিলো না। ‘এই ক্লাব সে সমস্যার সমাধানে ত্রাতা হিসেবে হাজির হয়েছে। এই ক্লাবের মাধ্যমে ইউডার ফার্মাসি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী যারা বিশ্ববিখ্যাত হার্ভাড ও এমআইটির মতো প্রতিষ্ঠানে পোস্ট ডক্টরেল করছেন তারা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সাথে কথা বলে খোঁজ খবর নিচ্ছেন, কি করতে হবে সে বিষয়ে পরামর্শ দিচ্ছেন।’

ফার্মাসি বিভাগে আরেক শিক্ষার্থী মাসুমা আক্তার যখন এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তখন স্বপ্ন ছিলো সর্বোচ্চ ক্যারিয়ার হবে ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ এ চাকুরি নেওয়া। কিন্তু এই রিসার্চ ক্লাবের সাথে সম্পর্ক হওয়ার পর থেকে ভাবনায় পরিবর্তন আসে। স্বপ্নও বেড়ে যায় বহুগুনে। মাসুমা এখন স্বপ্ন দেখছে উচ্চশিক্ষার। ‘প্লান্ট নিয়ে কাজ করে ভবিষ্যতে ওষুধ বানানোর স্বপ্ন দেখি, নিতে চাই উচ্চশিক্ষা’ বলল মাসুমা।

ইউডার রিসার্চ ক্লাবের একজন জুনিয়র সদস্য রাশেদুল ইসলাম। এই ক্লাব থেকে সে সিনিয়রদের সাথে ভালো যোগাযোগ রাখতে পারছে। তার কম্যুনিকেশন স্কিলস বাড়ছে। দেশের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে দরকারি সব পরামর্শ পাচ্ছে। ‘শুধু ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ এর মধ্যে নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ না রেখে গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে এ ক্লাবের সদস্যরা। এমনটিই প্রত্যাশা তার।’

ফার্মাসি রিসার্চ ক্লাবের সভাপতি ইমরান হোসেন রাজ। বললেন ক্লাব প্রতিষ্ঠার শুরুর কথা। ইউডার ফার্মাসি বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের অ্যালামনাইদেরকেই কৃতজ্ঞতা জানাতে চান। অ্যালামনাইদের একজন নাফিউজ্জামান। ফার্মাসি বিভাগের প্রাক্তন এ শিক্ষার্থী কোরিয়া থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি নিয়ে পোস্ট ডক্টরেল ফেলো করছেন হাউস্টন মেথোডিস্ট রিসার্চ ইনিস্টিটিউটে। স্বল্পকালীন ছুটিতে দেশে ফিরে তিনিই জমিয়েছেন ক্ষুদে গবেষকদের মিলন মেলা। তাই ক্লাবের সভাপতি পুরো কৃতিত্ব দিতে চান ড. নাফিউজ্জামানের।
বর্তমানে এ ক্লাবের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৮০ জন। এ ক্লাবের কাজের বিষয়ে ধারণা দেন ড. নাফিউজ্জামান। তিনি বলেন ‘বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে রিসার্চ নিয়ে খুব একটা ধারণা থাকে না। সামান্যা জার্নাল আর্টিকেলগুলো কিভাবে পড়তে হয়। কিভাবে ডাটাগুলো অ্যানালাইসিস করছে তা এই ক্লাবের সদস্যদের কাছে আমরা ব্যাখ্যা করি।’ ওদেরকে বলি ‘তুমি একটা আর্টিকেল পড়ো, সেটাকে প্রেজেন্টেশন দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিয়ে আসো। সে পড়তে গিয়ে তার যে অংশ বুঝে নাই সেটাকে আমরা বুঝিয়ে দিই। যারা রিসার্চ করতে চায় তাদের জন্য এটি খুবই ভালো।’
‘পড়ে পড়ে ডাটা অ্যানালাইসিস। রিসার্চ পেপারে কি কি আছে তা জানতে শুরুতে ওদের পরামর্শ দিই সহজ পেপার নাও। তুমি যদি একটু বুঝো তাহলে ক্লাসে এসে আমরা ডিটেলই বুঝাবো।’

ড. নাফিউজ্জামান বলেন, ‘এর পাশাপাশি এই ক্লাবের আমন্ত্রণে বিভিন্ন এক্সপার্টরা আসে এখানে তাদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করতে। তারা তাদের আইডিয়া শেয়ার করে।

ক্লাবের বর্তমান কার্যক্রম বিষয়ে বলেন, ক্লাবের সদস্যদের বিভিন্ন বিষয়ে কাউন্সিলিং করাচ্ছি। এর পাশাপাশি বিভিন্নজনকে রিসার্চ করাই। ফার্মাকোলজি ল্যাবে রিসার্চ করি। প্লান্ট, প্রেসক্রিপশন সার্ভে নিয়ে রিসার্চ করছি। কোনে ধরনের ড্রাগ বেশি চলে হাসপাতালগুলোতে সে বিষয়ে কাজ করছে আমাদের সদস্যরা। বিভিন্ন অনকোলজি এর নার্সদের পারফরমেন্স নিয়ে কাজ করছি। আমরা শিক্ষার্থীদের নিয়ে লেখাচ্ছি। এর কারণে প্রচুর স্টুডেন্ট পাচ্ছি। গ্রুপ পাচ্ছি। নিজেদের টাকায় তারা সবকিছু করছে।’ বর্তমানে গ্রুপভিত্তিক রিসার্চ হচ্ছে। ৩টি গ্রুপ ৩ ধরনের রিসার্চের সাথে সংযুক্ত। এই ক্লাবের সাথে সমন্বয় চলছে ইউডা সেন্টার ফর ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং সেন্টারও। সেখানে উচ্চশিক্ষা নিতে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের আইইএলটিএস প্রস্তুতি নেওয়ার কোর্স করানো হয়।
পৃথিবীতে যার যোগাযোগ যত ভালো তার শক্তি ততবেশি। শুধু পুথিঁগত বিদ্যায় নিজেকে আটকে না রেখে বাড়াতে হবে এক্সট্রা কারিকুলাম অ্যাক্টিভিটিস। এটি উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বর্তমানে গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। ‘এই ক্লাবের মাধ্যমে একটা ব্যাচের সাথে অন্য ব্যাচের সম্প্রীতির সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে, কে কি কাজ করতেছে, সবার আইডিয়াগুলোর সমন্বয়ে একসাথে কাজ করছি। তাই এটি আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য অনেক ভালো ভূমিকা রাখবে’ এমনটিই প্রত্যাশা ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ফজলে রাব্বির।