এক আবৃত্তি কর্মীর গল্প

আদীব মুমিন আরিফ,
প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকতে নতুন বই পেলে খুশিতে বাংলা বই নিয়ে কবিতা পড়ত।বন্ধুদের সাথে অঘোষিত প্রতিযোগিতা চলতো।টেলিভিশনে বিভিন্ন দিবসগুলোতে জাতীয় প্যারেড গ্রাউন্ডের কুচকাওয়াজ, সরাসরি প্রচারিত ভেসে আসা কবিতা আবৃত্তি পরিবারের অন্যদের শুনতে ভালো না লাগলেও বিপরীত ঘটত তার বেলায়। তবে এসব ক্ষেত্রে বাড়তি উৎসাহ দিতেন গুরু সত্যরঞ্জন সরকার।এছাড়া বড় বোন একটু আধটু কবিতা পড়তেন। কবি-সাহিত্যিকদের জন্মদিবসে, মৃত্যুদিবসে আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতার অনুষ্ঠানে আগ্রহ ছিলো তার। গ্রামের বাড়িতে বিদ্যুৎ না থাকায় বাংলাদেশ টেলিভিশনই ছিলো একমাত্র বিনোদন মাধ্যম। তবে টেলিভিশনের অন্যসব বিষয়ে মনোভাব তেমন ইতিবাচক না হলেও বাংলা ভাষা নিয়ে যে কোনো আয়োজনই তার পছন্দের তালিকায় স্থান পেত। বলছিলাম আবৃত্তি শিল্পী শহীদুল ইসলাম এর কথা। তার ডাক নাম পাপ্পু। আবৃত্তিশিল্পী আশরাফুল আলম,জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়,হাসান ইমাম,ভাস্বর বন্দোপাধ্যায়,ডালিয়া আহমেদদের মতো গুণী শিল্পীরা এতোদিনে প্রিয় হয়ে ওঠে শহীদুলের। এর পুরো কৃতিত্বটাই বাংলাদেশ টেলিভিশনকে দেয় শহিদুল।আবৃত্তির হাতেখড়িটা এভাবেই।

মফস্বলের স্কুলে বার্ষিক খেলাধুলা ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান না হওয়ায় নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ খুব একটা হয়নি।তবে পঞ্চম শ্রেণীতে থাকতে একবার গ্রামের সকল স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিয়ে সাংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতা কবিতা আবৃত্তিতে তৃতীয় হয় শহীদুল। এরপর মাধ্যমিক বিদালয়ে বার্ষিক সাংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতায় ৭ম থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত একবার ব্যাতীত প্রতিবছর আবৃত্তিতে প্রথম হয় শহীদুল।

ক্যাম্পাস ফিচার ডটকম কে আবৃত্তিতে হাতেখড়ি বিষয়ে শহিদুল ইসলাম(পাপ্পু) বলেন, অষ্টম শ্রেণীতে থাকতে বিটিভিতে প্রতি মঙ্গলবার দুপুরের সংবাদের পর ‘সুবর্ণ উচ্চারণ’ নামে একটি অনুষ্ঠান হতো।আমি এর নিয়মিত দর্শক শ্রোতা ছিলাম।তবে ‘সুবর্ণ উচ্চারণ’ আমার আগ্রহ বাড়ালেও এর শিল্পী নির্বাচন নিয়ে একটু দ্বিধা ছিলো সেসময় থেকেই। এছাড়া প্রতি সোমবার শ্রদ্ধেয় ফরহাদ খান এর উপস্থাপনায় ‘মাতৃভাষা’ অনুষ্ঠান ও রাতে ‘বাঙালীর বাঙলা’ নামে জাতীয় অধ্যাপক মোস্তফা নুরুল ইসলামের অনুষ্ঠান দেখতাম খুব মনোযোগ দিয়ে।মাতৃভাষা অনুষ্ঠান থেকে অধ্যাপক বিশ্বজিৎ ঘোষ, আবৃত্তিশিল্পী গোলাম সারোয়ারসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং বাংলা ভাষার প্রচার এবং প্রসারে, শিক্ষাদানে নিবেদিতপ্রাণ মানুষদের চিনতে শুরু করি। প্রতি শুক্রবারের সকালে মঞ্চনাটক,যাত্রাপালা ও নতুন কুড়ির অনুষ্ঠানও বাদ যেতোনা।এভাবেই নিয়মিত অনুষ্ঠান দেখে উচ্চারণ এবং আবৃত্তির বোধের মৌলিক বিষয়গুলো আয়ত্ব করি।

এ পথে জুটেছে শহীদুলের স্বীকৃত ও পুরস্কার। দশম শ্রেণীতে থাকতে জাতীয় শিশু পুরষ্কার প্রতিযোগিতার আবৃত্তিতে জেলা পর্যায় প্রথম হয়। তখন তার  এ বিষয়ে ছিলো না কোনো প্রশিক্ষক। কম প্রস্তুতিতে এই সাফল্য তাকে আবৃত্তিতে উৎসাহ জাগিয়েছিলো। এরপরে সরকারী দেবেন্দ্র কলেজে একাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় একবার সাংষ্কৃতিক প্রতিযোগিতায় পুরো কলেজের একাদশ,দ্বাদশ, স্নাতক, স্নাতকোত্তর শ্রেণির প্রতিযোগিদের পেছনে ফেলে প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হয় পাপ্পু।সেসময় বিচারকার্যের টেবিল থেকে শিক্ষকদের প্রেরণা ও প্রশংসা আবৃত্তিরত শহিদুলকে এই শিল্পে আগ্রহ বাড়িয়েছে।

শহিদুল ইসলাম মনসুর উদ্দিন বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ২০১০ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এসএসসি ও সরকারী দেবেন্দ্র কলেজ থেকে ২০১২ সালে এইচএসসি পাশ করে শহীদুল। এরপর ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগে ভর্তি হওয়া।ভর্তি হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে সখ্যতা গড়ে ওঠে জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সাথে। তখনো শহিদুলের ধারণা ছিলো না আবৃত্তির জন্য আলাদা কোনো সংগঠন থাকতে পারে!ভেতরে আবৃত্তির তৃষ্ণায় পীপাসার্ত শহীদুল আবৃত্তি সংগঠন ধ্বনির কর্মশালার খবর জানতে পেরে তৃষ্ণা মেটাতে আর দেরি করেনি। কর্মশালায় আবৃত্তিশিল্পী বেলায়েত হোসেন তাকে উৎসাহ দেয়। দেয় বাড়তি প্রেরণা। ধ্বনিতে বিভিন্ন আবৃত্তি অনুষ্ঠানে আয়োজক হিসেবে কাজ করে।এবং আবৃত্তির খুঁটিনাটি আয়ত্ব করতে থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবৃত্তি সংগঠনের সাথে সংযুক্ত থাকার কারনে দেশ বরেণ্য বিভিন্ন আবৃত্তি শিল্পীদের সান্নিধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১ম বর্ষে ২০১৪ সালে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় পরিষদ আয়োজিত আন্ত:বিশ্ববিদ্যালয় আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয় শহিদুল।ধ্বনিতে সাংগঠনিক তৎপরতায় ২য় বর্ষে ধ্বনির কার্যকরী সদস্য হিসেবে দায়িত্বপালন এবং ৩য় বর্ষে সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হয়।সাংগঠনিক সম্পাদক হওয়ার পর নির্দেশক এবং শিল্পী হিসেবে পাঁচবার আবৃত্তি প্রযোজনা করেন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেলিম আল দীন মুক্তমঞ্চে তিনটি প্রযোজনা করে, এবং নির্দেশক হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে একটি, জাতীয় গণগ্রন্থাগারে একটি।আমন্ত্রিত আবৃত্তি শিল্পী হিসেবে রেডিও ফুর্তি ও রেডিও আম্বারে আবৃত্তি করে দুইবার। এছাড়া দেশের বিভিন্ন আবৃত্তি সংগঠনের আমন্ত্রণে আবৃত্তি করেছে শহীদুল।ধ্যান ও জ্ঞান যার আবৃত্তি চর্চা সংগঠন তাকে মুল্যায়ন করবে না তাকি হয়। শহীদুল বর্তমানে  সভাপতি হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। ধ্বনিকে আরো গতিশীল করতে চান তিনি।

শহিদুলের স্বপ্ন একজন আবৃত্তি শিল্পী ও প্রশিক্ষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার। সেই সাথে আবৃত্তিকে জনসাধারনের কাছে জনপ্রিয় করে তোলা। বিশেষ করে সব গুণী শিল্পীদের সামনে নিয়ে আসা। গণ মানুষের মুক্তির পথ দেখাতে চায় শহীদুল আবৃত্তির মাধ্যমে।